রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে শনিবার অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিএনপি’র প্রতি জনগণের ৭০ শতাংশ রায় সম্মান করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডাঃ শফিকুর রহমান। ১১ দলীয় ঐক্যজোটের আয়োজিত ওই সমাবেশে তিনি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ লাঘব এবং পদ্মা নদীর পানির ন্যায্য অংশদানের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।
বিএনপি’র প্রতি সরাসরি সুর করে ডাঃ শফিকুর বলেন, ‘‘জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকা করবেন না। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে তারেক রহমান বলেছিলেন—যদি জনগণের পক্ষে কাজ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ তার জবাব দেবে। এখনো সময় আছে, এসে জনগণকে বলুন যে আপনারা জনগণের রায় মেনে নিচ্ছেন। জনগণ উদার; তারা ক্ষমা করবে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আজকের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে যারা ত্যাগ ও আত্মদান করেছেন, তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। স্বপ্নবাজ তরুণদের ত্যাগের ফলেই অনেকেই কারামুক্ত হয়েছেন, কেউ প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, কেউ মন্ত্রী বা বিরোধীদলীয় নেতা হয়েছে। তবু কৃতজ্ঞ না থেকে বিগত স্বৈরাচারযুগের পথে ফিরে যাওয়া দুঃখজনক।’’
জামায়াত আমির জুলাই আন্দোলনে তরুণদের সাহসের কথাও উল্লেখ করে বলেন, ‘‘বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে যে তরুণরা ভয় জয় করেছে, তাদের রক্ত ও আত্মত্যাগের ফলে দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছে। এখন তাদের ‘শিশু সংগঠন’ বা ‘গুপ্ত সংগঠন’ বলা হয়—এটি গ্রহণযোগ্য নয়।’’ তিনি গত ১৭ বছরে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে চলা আন্দোলনের কথাও স্মরণ করেন এবং বলেন, শেষ পর্যন্ত তরুণদের ত্যাগের ফলেই পরিবর্তন এসেছে।
সরকারি নিয়োগ ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে ডাঃ শফিকুর অভিযোগ তোলেন যে, ‘‘নির্বাচনী ইশতেহারে আপনাদের দাবি ছিল নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া কেউ ক্ষমতায় বসতে পারবে না। তবু এখন ৪২টি জেলায় প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে ও সিটি কর্পোরেশনেও প্রশাসক বসানো হয়েছে। আমরা চেয়েছিলাম একটি গুম কমিশন গঠন করা হোক, যাতে অতীতের অন্যায়গুলোর বিচার হয়—এটিতেও গুরুত্ব দেয়া হয়নি।’’
তিনি যোগ্যদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের মত করে গুরুত্বপূর্ণ কড়াগুলো বরখাস্তের নিন্দা জানান এবং বলেন, ‘‘জাতীয় সংসদে যদি সত্য কথা বলার সুযোগ না দেয়া হয়, আমরা জনগণের কাছে গিয়ে কথা বলব—সেখানে কোনো স্পিকারের অনুমতি লাগে না। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’’
ভয় ভাঙার চেষ্টা হলে তারা পিছপা হবে না বলেও জানান তিনি। ‘‘যারা ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও হাসিমুখে জীবন দিতে পারে, তাদের ভয়ে আটকানো যায় না। আমরা প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে সম্মান করি, কিন্তু কেউ চোখ রাঙালে তা মেনে নেওয়া হবে না। দেশের শান্তি নষ্ট করা হলে জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।’’
পদ্মা ও তিস্তা নদীর অবস্থা নিয়ে তিনি বললেন, ‘‘নদীগুলো আজ অনেক অংশে মরুভূমির মতো হয়ে পড়ছে। আমরা চাই—নদীগুলো প্রাণ ফিরে পাক। খাল খননের উদ্যোগ ভাল, কিন্তু নদীতে পানি না থাকলে খাল খননের সুফল পাওয়া যাবে না।’’
সমাবেশে জামায়াত আমির স্পষ্ট করে বলেন, ‘‘সরকারকে গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বাধ্য করা হবে। আমাদের আন্দোলন তখনই শেষ হবে যখন দাবি বাস্তবায়িত হবে। আমরা দেশের সম্মান বাঁচাতে জীবন দিতে প্রস্তুত, কিন্তু কখনো সম্মান বিসর্জন দেব না।’’
সমাবেশের যৌথ সঞ্চালক ছিলেন রাজশাহী মহানগর সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মন্ডল ও জেলা সেক্রেটারি গোলাম মুর্তুজা। সভাপতিত্ব করেন দলটির কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি ও রাজশাহী অঞ্চল পরিচালক মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী মহানগরীর আমির ড. মোঃ কেরামত আলী এমপি, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডাঃ মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমির মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির অধ্যাপক সিরাজুল হক, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অবঃ) অলি আহমদ বীর বিক্রমসহ জেলা ও মহানগর নেতৃত্ব ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি বৃন্দ।