ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), যা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতের বেশ কিছু রাজ্য এখন বিজেপির আওতায় চলে গেছে, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন শঙ্কা ও উদ্বেগের কারণ সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে হওয়া নির্বাচন ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়, তাই এর ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর কোনও প্রভাব পড়বে না। তবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই সেখানে কিছু দলীয় নেতা বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন। নির্বাচনের পর থেকে বিজেপি ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ বিতাড়নের বিষয়ক আলোচনাও তুঙ্গে ওঠে এবং আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মন্তব্য করেছেন। তা নিয়ে বাংলাদেশে উদ্বেগ প্রকাশ হয়েছে, বিশেষ করে ভারতের রাজ্যগুলোর শাসকদের পূর্ববর্তী কার্যকলাপকে কেন্দ্র করে। বিভিন্ন বিশ্লেষক ও কূটনীতিকরা সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, এসব বিষয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতে সম্পর্কের উপর প্রভাব পড়তে পারে।
প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর মধ্যে বিজেপির আধিপত্য বিস্তার ব্যাপক, যেখানে ত্রিপুরা, আসামসহ মেঘালয় থাকছে। এসব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা পাকিস্তান ও বাংলাদেশ বিরোধী ভাষণ দিয়ে আসছেন, যা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব করে বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তিতে নতুন আশার আলো জেগেছে, তবে একই সঙ্গে অনিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গ উভয়েই নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে এই চুক্তি নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ ওবায়দুল হক বলেছেন, বিজেপি কি সত্যিই তিস্তা চুক্তিতে এগিয়ে আসবে সেই বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়, তারা বাংলাদেশকে নিছক আশ্বাস দেয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানও উল্লেখ করেছেন, ভারতের নতুন সরকারের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে চুক্তির ভবিষ্যৎ।
নিরাপত্তা ও অভিবাসন বিষয়েও ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে। বিজেপির ইশতেহারে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশসীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়তে পারে এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা নতুন করে শুরু হতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে, কারণ এর মাধ্যমে সীমান্তে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ট্রানজিটের ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তনের আশা কড়ে উঠেছে, যেখানে কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে তালমিল বাড়ার ব্যাবস্থা হতে পারে। এতে করে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য আরও সহজতর হবে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারতের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের ফলাফল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব ফেলবে না। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, ভারতে নির্বাচন তার নিজস্ব বিষয়, আমাদের লক্ষ্য করব স্বার্থে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং সমাধান খোঁজা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক নেতা-মন্ত্রীরা নানা ধরনের বক্তব্য দিতে পারে, তবে বাস্তবতা আলাদা। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর নাম এন্ট্রি হওয়া পরিস্থিতি নির্ভর করবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের উপর। তিস্তা চুক্তি প্রসঙ্গে তারা বলছেন, বিজেপি কখনোই স্পষ্ট আশ্বাস দেয়নি, তাই এত বেশি আশা করা ঠিক হবে না। তবে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার ফলে কিছু অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তবে পুশব্যাকের ঝুঁকিও রয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা বদলের ফলে সম্ভাব্য পুশইন পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে। তিনি সতর্ক করেছেন, হলে কোনও অপ্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সরকার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে।
ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো বিশ্লেষণ করছে যে, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নির্বাচনে বিজেপির জয়ের ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির উপর আরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে সীমান্ত, নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা হয়তো আরও কঠোর হবে। তবে এতদিনের মতো, এসব পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য কিছু স্পর্শকাতর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যেখানে অভ্যন্তরীন রাজনীতি ও সীমান্ত পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।