জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের দেওয়া গণভোটের রায় বৃথা যেতে দেওয়া হবে না এবং সেটি বাস্তবায়িত হবে। বুধবার রাজধানীর কাকরাইলে আইডিইবি ভবনে ‘‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং আমাদের বাস্তবতা’’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘‘আমরা আত্মবিশ্বাসী; রাজপথে ও সংসদে আমাদের আন্দোলন সমান তালে চলছে। দিনের পর দিন এটি আরও বেগবান হবে।’’ তিনি সরকারের উদ্দেশ্যে বলেছেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা ব্যক্তিগত মান-অভিমানকে প্রাধান্য না দিয়ে জনগণের দেওয়া রায়কে সম্মান দেখাতে হবে। জাতীয় স্বার্থে সব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
জামায়াত আমির অভিযোগ করেন, সরকার জনসম্মুখে জুলাই চার্টারকে ‘‘একটা অন্তহীন প্রতারণার দলিল’’ বললেও একই সংসদে দাঁড়িয়ে দেশকে প্রতারণা করেছেন। তিনি সরকারের সমালোচনায় افزودেন, যারা জনগণের বিবেচনা-ক্ষমতার ওপর প্রশ্ন তোলে, তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। প্রমাণসহ বলেন—যদি চারটি প্রশ্নই সাধারণ মানুষ না বোঝে বলে দাবি করা হয়, তাহলে ৩১টি প্রশ্ন কিভাবে বোঝবে? প্রশ্ন তুলায় তারা গণতন্ত্রের মৌলিক বিশ্বাসটি অস্বীকার করছে।
শফিকুর রহমান আরও বলেন, ৫ আগস্টের পর অনেকের কাছে শহীদ পরিবারের কাছে গিয়ে সান্ত্বনা প্রদানের প্রয়োজনীয়তা বিবেচ্য ছিল। কিন্তু কেউ কেউ তখন থেকেই নির্বাচনের জিকির শুরু করার কারণে, তাদের কাছে তাদের আপন সঙ্গীর রক্তের মূল্য নেই—এমন কঠোর মন্তব্যও তিনি করেন।
সেমিনারে অন্যান্য বক্তব্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন সরকারের কাছে দ্রুত গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও তা বাস্তবায়নের দাবি জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আর রক্তপাত দেখতে চায় না; তারা শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পথে রাষ্ট্রের কাঙ্খিত সংস্কার ও রূপান্তর চাই।
আখতার হোসেন একইসঙ্গে উল্লেখ করেন, সংসদে সরকারের বক্তব্য ছিল—চার প্রশ্নের সাড়ে তিনটি তারা মানেন, আধাটা মানেন না। তিনি বলেন, দেশের ৭০ শতাংশ ভোটার ওই চারটি প্রশ্ন মেনে গণভোটকে জয়ী করেছেন, তাই জনগণের রায়ের বাইরে থেকে কোনো অংশ মানা বা মানা না—এমন অবস্থান গ্রহণ করার সুযোগ নেই।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল অলি আহমদ প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সংস্কারের যেসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তার নেতৃত্ব প্রধানমন্ত্রী নিজে নেবেন—কারণ এটি তার রাজনৈতিক ও পারিবারিক ঐতিহ্যের বিষয়। তিনি বলেন, ইতিহাসের একজন নেতার মতো উদ্যোগ নিলে তার গ্রহণযোগ্যতায় কোনো ক্ষতি হবে না।
এলডিপি সভাপতির একাংশ দাবি ছিল—বিএনপির বেশ কয়েক জন নেতা ২০১৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার কাছ থেকে অর্থ নিয়েছিলেন; তিনি চান, যদি প্রধানমন্ত্রী জানতে চান, তিনি নির্দোষভাবে যে-কে কত কোটি টাকা নিয়েছে, সেই তথ্য জানাতে পারবেন। (এটি এলডিপি সভাপতির বক্তব্য এবং তা সংবাদে তুলে ধরা হয়েছে।)
সেমিনারের সঞ্চালনায় ছিলেন জামায়াত ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, আমার বাংলাদেশ পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার প্রমুখ।
সেমিনারের বিভিন্ন বক্তব্যে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার ও জুলাই হত্যাযজ্ঞের সুবিচারের দাবি জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য ও দায়িত্বশীল আচরণে বারবার গুরুত্ব আরোপ করা হয়।