ভারতের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জি-ফাইভ ভারতীয় ক্যাটালগ থেকে বিতর্কিত চলচ্চিত্র ‘সতলুজ’ সরিয়ে নেওয়ায় তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। মুক্তির মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ছবিটি ভারতের দর্শকদের জন্য স্ট্রিম করা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে প্ল্যাটফর্মের গ্লোবাল ভার্সনে ছবিটি এখনও দেখা যাচ্ছে।
ছবিটি শিখ মানবাধিকারকর্মী জশবন্ত সিং খালরার জীবনের ওপর নির্মিত। প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা ও গায়ক দিলজিৎ দোসাঞ্জ; ছবির পরিচালনা করেছেন হানি ত্রেহান এবং আরজুন রামপালও একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন।
ছবিটির আকস্মিক প্রত্যাহারের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন দিলজিৎ দোসাঞ্জ নিজেই। সামাজিক যোগাযোগে তিনি খোলাখুলি প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, তিনি এই নিষেধাজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ জানাবেন এবং খালরার সংগ্রামের কণ্ঠস্বর দমানো যাবে না। দোসাঞ্জ আগেই আশঙ্কা করে একটি ইনস্টাগ্রাম লাইভে ভক্তদের বলেছিলেন যে ছবিটি হয়তো শীঘ্রই সরিয়ে নেওয়া হবে এবং তখন অনুরোধ করেছিলেন ভক্তরা এটি সংরক্ষণ করে রাখুন।
দিলজিৎ রাজস্থানে খোলা আকাশে প্রজেক্টরের মাধ্যমে হওয়া এক গণপ্রদর্শনীর ভিডিও এক্সে (সাবেক টুইটার) শেয়ার করে পাঞ্জাবিতে লিখেছেন যে ছবিটি আর থামানো যাবে না এবং খালরার কণ্ঠস্বর দমতবে না।
জি-ফাইভ কর্তৃপক্ষ একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায় যে ‘সতলুজ’ মুক্তির পর দর্শকদের সাড়া অত্যন্ত প্রবল ছিল এবং তারা ছবিটির সৃজনশীলতাকে সমর্থন করে। তবে বর্তমান পরিস্থিতির কারণে এবং আইনি প্রক্রিয়ার প্রেক্ষিতে ভারতের জন্য স্ট্রিমিং সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে; পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে। জি-ফাইভ বলেছে তারা যথাযথ আইনি পথে ছবিটি দ্রুত ভারতীয় দর্শকদের কাছে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে।
ছবিটি কেন বিতর্কিত?
চিত্রনাট্যে ১৯৮৪-১৯৯৪ সালের মধ্যে পাঞ্জাবে পুলিশের হাতে নিখোঁজ এবং বিচারের বাইরে হত্যাকাণ্ডের শিকারদের খোঁজ ও সৎকারের লড়াই তুলে ধরা হয়েছে। জশবন্ত সিং খালরা তাঁর তদন্তে প্রায় ২৫ হাজার অজ্ঞাত পরিচয়ের মৃতদেহের সন্ধান দেন এবং পুলিশি জড়িততার তথ্য সামনে আনেন। ১৯৯৫ সালে খালরাকে অপহরণ করে পরে পুলিশ হেফাজতেই তাকে হত্যা করা হয়; সিবিআই তদন্তের পর ২০০৭ সালে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টে চারজন পুলিশকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই ইতিহাসের সংবেদনশীলতা এবং কর্তৃপক্ষের ভূমিকাকে কিভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে—এই দুই কারণে ছবিটি বিতর্কের কেন্দ্রে আসে।
তিন বছরব্যাপী সেন্সরজট
‘সতলুজ’ ওটিটি পর্যন্ত পৌঁছতে সহজ পথ পায়নি। ২০২২ সালে ছবিটি সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশনকে (সিবিএফসি) জমা দিলে বোর্ড ১২৭টি দৃশ্য কাটা এবং শিরোনাম পরিবর্তন করে ‘পাঞ্জাব ৯৫’ রাখার নির্দেশ দেয়। প্রযোজকরা প্রথমে বম্বে হাইকোর্টে আপিল করেন, পরে সেই আপিল প্রত্যাহার করেন। টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবের প্রিমিয়ার থেকেও ছবিটি সরিয়ে নেওয়ার পরে অবশেষে ২০২৪ সালের ৩ জুলাই ‘সতলুজ’ হিসেবে জি-ফাইভে মুক্তি পায়। নির্মাতা জানিয়েছেন থিয়েট্রিক্যাল রিলিজের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্যে ওটিটি মুক্তির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল এবং ছবি সেন্সর সার্টিফিকেট ছাড়াই প্ল্যাটফর্মে ঢোকানো হয়েছিল। দিলজিৎও দাবি করেছেন যে ওটিটিতে ছবিটি কোনো কাটছাঁট ছাড়াই স্ট্রিম করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
ছবিটি ভারতের ক্যাটালগ থেকে সরিয়ে নেওয়া হলে পাঞ্জাবের রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শিরোমনি আকালি দল (এসএডি) বলেছে এটি ইতিহাস ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। কংগ্রেস নেতা সুখপাল সিং খাইরাও ছবিটি দ্রুত প্ল্যাটফর্মে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান এবং বলেন ছবিতে দেখানো মানবাধিকার লঙ্ঘন আদালতের রায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আম আদমি পার্টি (এএপি) ও অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিরা কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপি-কে সমালোচনা করেছেন, বলছেন পাঞ্জাবে সত্য উদঘাটনে তারা ভয় পাচ্ছে। শিরোমনি গুরুদ্বারা প্রবন্ধক কমিটি (এসজিপিসি) জনগণের মতামত তৈরির অধিকার থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেছে।
সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন কেন একধরনের রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ছবিগুলো সহজে মুক্তি পায়, আবার মানবাধিকার ভিত্তিক এই ছবিটি ব্লক করা হচ্ছে—তাতে দ্বিমুখী নীতি ও পক্ষপাতমূলক সেন্সরশিপের অভিযোগ জোরদার হয়েছে। তারা ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’, ‘দ্য কেরালা স্টোরি’ ও ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ ইত্যাদি উদাহরণ টানছেন, যেসব ছবির ওপর তুলনামূলকভাবে বাধা ছিল না।
অবশেষে, জি-ফাইভ ভারতের ক্যাটালগ থেকে ‘সতলুজ’ সরিয়ে নিলেও এ বিতর্ক থামার আশঙ্কা কম। চলচ্চিত্রটির গল্প, ইতিহাস ও মুক্তির ওপর সরকারি ও বেসরকারি স্তরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেই রয়ে যাবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।