গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর (ডিআর কঙ্গো) পূর্বাঞ্চলের ইতুরি প্রদেশে ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) পরিস্থিতিটিকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়ে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে। ঘটনার কেন্দ্রস্থল হিসেবে বুনিয়া, মংওয়ালু ও রামপরা নামক অঞ্চলগুলো লক্ষ করা হচ্ছে।
সরকারি ও স্বাস্থ্যসংস্থার তথ্যে এ পর্যন্ত এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ২৪৬ জনকে রোগী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে পরীক্ষার ভিত্তিতে এখনও মাত্র আটটি কেস ল্যাব-নিশ্চিত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে—এর মানে প্রকৃত সংক্রমণের পরিমাণ আরো বেশি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে ডব্লিউএইচও। সংস্থাটি একই সঙ্গে বলেছে, এই ধাক্কা এখনও বৈশ্বিক মহামারি বা প্যান্ডেমিক হিসেবে ঘোষণা করার পর্যায়ে পৌঁছেনি।
ডব্লিউএইচও মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধানম গেব্রেইয়েসুস বলেছেন, আক্রান্ত ও সংক্রমিত এলাকায় ভাইরাস কতটা ছড়িয়েছে এবং রোগীর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে এখনও অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে। সংস্থাটি পরিস্থিতি দ্রুত পর্যবেক্ষণ ও মাত্রা নির্ধারণে কঙ্গো ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ঘন সমন্বয় করছে।
স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্রাদুর্ভাবের কারণ হিসেবে此次 ইবোলার বুন্দিবুগিও (Bundibugyo) স্ট্রেইন জড়িত। উদ্বেগের জিনিসটি হলো—এই ধরনটির বিরুদ্ধে বিশেষভাবে অনুমোদিত কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন এখনও তৈরি হয়নি। ফলে আক্রান্তদের চিকিৎসা, দ্রুত আইসোলেশন এবং সংক্রমণ চেইন ভাঙাই এখন প্রধান অস্ত্র।
ডব্লিউএইচও ও স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানান, নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত আলাদা আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দিতে হবে। রোগীকে ছাড়ার আগে দুইটি ‘বুন্দিবুগিও’ ভাইরাস পরীক্ষার ফল অন্তত ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে করা হলে উভয়টি নেগেটিভ হতে হবে।
ডিআর কঙ্গোর বাইরেও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে—প্রতিবেশী দেশ উগান্ডায় দুইজনের শরীরে ইবোলা শনাক্ত হওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। সীমান্তবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত মানুষের চলাচল, ব্যবসা ও ভ্রমণের কারণে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে বলে সতর্ক করা হয়েছে। ডব্লিউএইচও কঙ্গো ও উগান্ডাকে অবিলম্বে জরুরি অপারেশন সেন্টার খোলার পরামর্শ দিয়েছে, যেন ট্রেসিং, রোগীর সনাক্তকরণ ও সংক্রমণ প্রতিরোধ কার্যক্রম সুসংগঠিতভাবে করা সম্ভব হয়।
কঙ্গোর একটি হাসপাতালে গত বৃহস্পতিবার মারা যাওয়া ৫৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তির নমুনায় ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্যকর্মীরা অভিযোজন করে রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে পর্যবেক্ষণে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
ইবোলা সাধারণত সংক্রামিত মানুষের রক্ত, শরীরের তরল বা চামড়ার ক্ষত থেকে ছড়ায়। রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে জ্বর, পেশী ব্যথা, ক্লান্তি, মাথাব্যথা ও গলা ব্যথা দেখা যায়; পরে বমি, ডায়রিয়া, চামড়ায় ফোসকা ও রক্তক্ষরণের মতো গুরুতর অবস্থায় রূপ নিতে পারে। ইবোলার নির্দিষ্ট কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই এবং এর মৃত্যুহার গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বলে ধরা হয়।
আফ্রিকা সিডিসি’র নির্বাহী পরিচালক ড. জিন কাসেয়া বলেছেন, রামপরা, বুনিয়া ও মংওয়ালুর খনি এলাকায় ঘনবসতি ও মানুষের ব্যাপক চলাচলের কারণে আঞ্চলিক সমন্বয়ের মাধ্যমে মোকাবিলা করা জরুরি। এই অঞ্চলে দ্রুত পরীক্ষার কিট, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানো প্রয়োজন।
আইতিহাসিকভাবে ১৯৭৬ সালে বর্তমান কঙ্গোতেই প্রথম ইবোলা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। গত ৫০ বছরে আফ্রিকায় ইবোলায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন; ডিআর কঙ্গোতে ২০১৮-২০২০ সালের প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি—প্রায় ২,৩০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। গত বছরও এক অঞ্চলে ৪৫ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছিল।
ডব্লিউএইচও সীমান্ত বন্ধ বা বাণিজ্য ও ভ্রমণে জোরপূর্বক নিষেধাজ্ঞা দিতে অনুরোধ করছে না, তবে সীমান্তরক্ষীদের নজরদারি বাড়ানোর এবং যাতায়াতের মাধ্যমে সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগের পরামর্শ দিচ্ছে।
এই প্রতিবেদনটি সাম্প্রতিক সংবাদ সংস্থা বিবিসির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা হয়েছে।