বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) বলছে, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের এল নিনো পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হয়ে দ্রুত ‘‘সুপার’’ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যা বিশ্বজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা, ভারী বর্ষণ ও অন্যান্য চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়িয়ে দিতে পারে। সংস্থাটি শুক্রবার (৩ জুলাই) এক সতর্কবার্তায় এই পূর্বাভাস প্রকাশ করে এবং সরকারের পাশাপাশি মানবিক ও জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোকে প্রস্তুতি বাড়ানোর আহ্বান জানায়।
ডব্লিউএমও জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের কেন্দ্রীয় ও পূর্ব নিরক্ষীয় অঞ্চলে ইতোমধ্যে এল নিনোর লক্ষণ দেখা গেছে এবং পরবর্তী কয়েক মাসে এটি দ্রুত তীব্র রূপ ধরতে পারে। বহু উন্নত মাল্টি-মডেল পূর্বাভাসে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা নিরীক্ষণ অঞ্চলগুলোতে স্বাভাবিকের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, ফলে বিজ্ঞানীদের আস্থা বাড়ছে যে এটি উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হবে।
ডব্লিউএমওর মহাসচিব চেলেস্তে সাউলো বলেন, এল নিনো ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং দ্রুত শক্তিশালী হবে; এর ফলে বিশ্বের অনেক অঞ্চলে খরা ও ভারী বর্ষণ দুটোই তীব্রতর হবে, পাশাপাশি স্থল ও সমুদ্র উভয়েই তাপপ্রবাহ বাড়বে। তিনি আরও বলেন উন্নত মৌসুমি পূর্বাভাস এবং আগাম সতর্কবার্তা জীবন বাঁচাতে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব কমাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এল নিনো কী এবং এর সময়গত বৈশিষ্ট্য
এল নিনো হলো বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণকারী ‘এনসো’ (এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন)-র একটি পর্যায়, যা কেন্দ্রীয় ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বাড়িয়ে দেয়। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছরে একবার এল নিনো সৃষ্টি হয় এবং এর স্থায়িত্ব সাধারণত ৯–১২ মাসের মতো থাকে; সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে তীব্রতা বেশি হয়। তবে প্রতিটি এল নিনোর প্রভাব তার তীব্রতা, স্থায়িত্ব এবং অন্য জলবায়ু চালকের (যেমন ভারত মহাসাগরের ডাইপোল) সঙ্গে আন্তক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে অনেক বদলে যায়। ডব্লিউএমও এল নিনোর তীব্রতাকে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করলেও ‘‘সুপার এল নিনো’’ শব্দটি তাদের আনুষ্ঠানিক শ্রেণিবিভাগের অংশ নয়।
তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস
ডব্লিউএমওর গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আপডেটে বলা হয়েছে, জুলাই–সেপ্টেম্বর সময়ে বিশ্বের বেশিরভাগ জনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে। নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রে স্বাভাবিকের তুলনায় উচ্চ তাপমাত্রার সম্ভাবনা ৮০ শতাংশেরও বেশি। ভারতের মহাসাগর ও ক্রান্তীয় আটলান্টিকেও স্বল্প বা মাঝারি উষ্ণতার পূর্বাভাস রয়েছে।
বৃষ্টিপাতে এল নিনোর প্রভাব অনিবার্যভাবে ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন রকম হবে—কেন্দ্রীয় ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্তে বৃষ্টিপাত বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও ভারতের উপমহাদেশ, প্রশান্ত মহাসাগরের অনেক অংশ এবং অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে খরা এবং স্বাভাবিকের তুলনায় কম বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে। নিরক্ষীয় আফ্রিকায় একটি পূর্ব-পশ্চিম বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে: গিনি উপসাগরের উত্তরের সীমানায় বেশি বৃষ্টি হতে পারে, কিন্তু ‘গ্রেটার হর্ন অব আফ্রিকা’ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান ও দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে কম বৃষ্টি হতে পারে; সেটার বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু অংশে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টি হতে পারে। ইউরোপের দক্ষিণ অংশে বৃষ্টিপাত বাড়ার এবং উত্তর অংশে কম বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, তবে ইউরোপের জন্য এগুলোর নির্ভরযোগ্যতা কিছুটা সীমিত বলেও ডব্লিউএমও সতর্ক করেছে।
প্রস্তুতি ও সমন্বয়
ডব্লিউএমও ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশে জলবায়ু তথ্য ও সতর্কতা পরিষেবা জোরদার করছে যাতে সরকার ও মানবিক সংস্থাগুলো আগেভাগে ঝুঁকি মূল্যায়ন করে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে পারে। জাতিসংঘ ও মানবিক অংশীদারদের জন্য নিয়মিত ব্রিফিং ও টেকনিক্যাল সেশন চালানো হচ্ছে; গত ২৪ জুন অনুষ্ঠিত বিশেষ ব্রিফিংয়ে অ্যাগ্রিমেট আঞ্চলিক জলবায়ু কেন্দ্র ২০২৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকান ও সাহেল বর্ষাকালের আঞ্চলিক পূর্বাভাস তুলে ধরেছিল। এছাড়া ডব্লিউএমও আঞ্চলিক সমন্বয়, যোগাযোগ ও প্রস্তুতি বাড়াতে একাধিক ওয়েবিনার এবং আলোচনাসভা আয়োজন করছে।
ডব্লিউএমও এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সরকারের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছে—কৃষি, স্বাস্থ্য ও জলাশয় ব্যবস্থাপনা মতো জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতে আগাম সতর্কতা ও সাময়িক উদ্যোগ জোরদার করতে হবে, দুর্বল জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় নীতি ও তহবিল প্রস্তুত রাখতে হবে এবং তাপপ্রবাহ, বন্যা বা খরার ক্ষেত্রে জরুরি তৎপরতা নিশ্চিত করতে হবে।
সংক্ষেপে, যে সতর্কবার্তাগুলি ডব্লিউএমও দিয়েছে সেগুলো এখনই গুরুত্ব নিয়ে নেয়া দরকার—উচ্চ তাপমাত্রা, অসম বৃষ্টিপাত ও অতিবেগুনি আবহাওয়ার ঘটনা মানুষের জীবন, কৃষি ও অর্থনীতির ওপর তীব্ররূপে প্রভাব ফেলতে পারে। আগাম সতর্কতা, শক্তিশালী মৌসুমি পূর্বাভাস ও সমন্বিত প্রস্তুতি এই ঝুঁকি কমাতে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হবে।