সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে—মোট ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বুধবার (১ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংক এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরের (জুলাই-জুন) ১২ মাসে দেশে বৈধ চ্যানেলে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরে একই পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৩২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৫২৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার—প্রতিষ্ঠানটি বৃদ্ধির হার জানিয়েছে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে এত বেশি রেমিট্যান্স আগে কখনো আসেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হুন্ডি প্রতিরোধে সরকারের দৃঢ় অবস্থান, বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠালে নগদ প্রণোদনা, ব্যাংকিং সেবার সহজলভ্যতা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দ্রুত লেনদেনের সুযোগ বৃদ্ধি পায় প্রবাসীরা আগের তুলনায় বেশি বৈধ চ্যানেল ব্যবহার করছেন। এ কারণগুলোর সমন্বয়ে চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্সে ভালো প্রবৃদ্ধি ধরা পড়েছে।
তবে অর্থবছরের শেষ মাস জুনে রেমিট্যান্সের প্রবাহে কিছুটা ঝাঁকুনি দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জুনে দেশে রেকর্ড হওয়া মাসিক অঙ্কের তুলনায় কম—চলতি বছর জুনে এসেছে ২৮০ কোটি ৬ লাখ মার্কিন ডলার, যা গত সাত মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছরের জুনের তুলনায়ও এই মাসে রেমিট্যান্স কিছুটা কমেছে। কিন্তু উল্লেখ্য, ব্যাংক হলিডের কারণে ১১টি ব্যাংকের তথ্য চূড়ান্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি; ফলে চূড়ান্ত হিসাবিক অঙ্ক একটু বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত বছরের অক্টোবরে মাসিক রেমিট্যান্স ছিল সবচেয়ে কম—২৫৬ কোটি ২৪ লাখ ডলার। সংশ্লিষ্টদের মন্তব্য, মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে ঈদকে কেন্দ্র করে প্রবাসীরা পরিবার-পরিজনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ পাঠান; ঈদ-পরবর্তী সময়ে সেই চাহিদা কমে যাওয়ায় জুনে স্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি নামা মাত্রা দেখা গেছে।
মাসভিত্তিক রেমিট্যান্সের ছবিতে গত অর্থবছরে আয় ছিল এইরকম: জুলাইয়ে ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলার, আগস্টে ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ডলার, সেপ্টেম্বরে ২৬৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, অক্টোবরে ২৫৬ কোটি ২৪ লাখ ডলার, নভেম্বরে ২৮৮ কোটি ৯৭ লাখ ডলার, ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ৩৬ লাখ ডলার, জানুয়ারিতে ৩১৭ কোটি ১৬ লাখ ডলার, ফেব্রুয়ারিতে ৩০২ কোটি ডলার, মার্চে ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ ডলার, এপ্রিলে ৩১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার, মে মাসে ৩৪২ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং জুনে ২৮০ কোটি ৬ লাখ ডলার।
রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্তিশালী অবস্থানে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট (গ্রস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে নিট ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ রয়েছে ৩২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রেমিট্যান্স বাড়ার ধারা বজায় থাকলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, লেনদেন ঘাটতি মোকাবিলা এবং বৈদেশিক মুদ্রা ঠিক রাখতে সহায়ক হবে। তবে সারাবছর এই প্রবাহ ধরে রাখতে খোলা ব্যাংকিং চ্যানেল, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উন্নয়ন ও হুন্ডি প্রতিরোধে কার্যকর নীতি বজায় রাখা জরুরি।