বঙ্গোপসাগরের গভীর লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর মিলিত প্রভাবে মোংলা সমুদ্রবন্দর ও সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় টানা সাত দিন ধরে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। দিনভর বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি বৃদ্ধির কারণে এলাকার স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়ে পড়ে; নিচু ক’টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়ে হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন।
সবচেয়ে ভোগান্তি দেখা দিয়েছে চিংড়ি চাষিদের। বুড়িরডাঙ্গা, চিলা, চাঁদপাই, সুন্দরবন, সোনাইলতলা ও মিঠাখালীসহ একাধিক ইউনিয়নের শত শত চিংড়ি ঘের জলের তলায় চলে আসছে। চলমান বৃষ্টিতে পশুর ও মোংলা নদীর জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২-৩ ফুট বাড়ায় অনেক ঘেরের পাড় ছুঁই ছুঁই অবস্থায় পৌঁছেছে। চাষিরা রাতদিন করে নেট, পাটা ও বাঁশের বানা দিয়ে মাছ আটকে রাখার চেষ্টা করছেন, তবু ঘেরের পাড় ভেঙে বা ওপরে থেকে পানি ঢুকলে কোটি-কোটি টাকার গলদা ও বাগদা চিংড়ি ভেসে যাওয়ার যোগ্য পরিস্থিতি তৈরি হবে বলেই তাদের আশঙ্কা। অনেকেই ব্যাংক ঋণ ও উচ্চ সুদে নেয়া কিস্তি পরিশোধের চাপ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
বৈরী আবহাওয়ার প্রভাব পুরো বন্দরের কার্যক্রমে পড়েছে। মোংলা বন্দরে থাকা খাদ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর চাল, সার জাতীয় খোলা (বাল্ক) পণ্যের খালাস-বোঝাই কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া রকমের খাদ্যপণ্য ভেজে নষ্ট হওয়া রোধে জাহাজের হাচ (ঢাকনা) বন্ধ রাখা হয়েছে, ফলশ্রুতিতে পণ্য খালাস বাধাগ্রস্ত এবং জাহাজগুলোর অবস্থানকাল বৃদ্ধি পাচ্ছে। বন্দরের হারবার বিভাগ জানিয়েছে যে শুধুমাত্র যান্ত্রিকভাবে তরল পদার্থ ও কন্টেইনার খালাস সীমিতভাবে করা সম্ভব হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৬ জুন মোংলা বন্দরে নোঙর করা এক জাহাজে ছিল 5,700 মেট্রিক টন চাল; যেখানে খালাস করতে স্বাভাবিকভাবে প্রায় ৪ দিন লাগার কথা, আবার বৃষ্টির কারণে এখন পর্যন্ত ১৪ দিনে মাত্র 920 মেট্রিক টনই খালাস করা গেছে। অন্যান্য জাহাজের পণ্যও একের পর এক থমকে আছে, ফলে আন্তর্জাতিক লজিস্টিকে বিলম্ব ও আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
টানা বৃষ্টিতে মোংলা পৌরশহরের অনেক সড়ক ও নিম্নভূমি প্লাবিত হওয়ায় ড্রেনেজ কুয়াশা বাধা পাচ্ছে এবং কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। দিনমজুর, রিকশা-ভ্যান চালক, খেয়াঘাটের মাঝি ও অন্যান্য নিম্ন আয়ের মানুষgroepগুলো কাজ হারিয়ে ও রাস্তাঘাট বন্ধ হওয়ায় খাবারাভাবে সংকটে পড়েছেন। বহু পরিবার ঘর থেকে বেরতেই পারছে না।
শিক্ষার্থীরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন; কাঁচা ও আধা-পাকা পথ প্লাবিত হওয়ায় অনেকের জন্য স্কুল-কলেজে যাওয়া অসম্ভব হয়ে উঠেছে।-উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, হতে পারে পাঠদানেও প্রভাব পরবে।
মোংলা আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ হারুন আর রশিদকাল জানিয়েছেন, সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল আছে এবং উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে থাকা সকল মৎস্যজীবী নৌকা-ট্রলারকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের ধারণা উপকূলীয় এলাকায় আরও দু-এক দিন বৈরী আবহাওয়া ও বৃষ্টি থাকতে পারে।
আঞ্চলিক প্রশাসন ও বন্দর কর্তৃপক্ষ দ্রুত পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে কাজ করছে — ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম, নৌপরিবহন বরাদ্দ ও ঘের রক্ষা সংক্রান্ত পরামর্শ প্রচার করা হচ্ছে। তবুও চাষি-জেলেদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি ও বন্দরে লেনদেনে দীর্ঘদিনাপর্যন্ত বিঘ্নিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে স্থানীয়রা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।