সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী ব্লগার ও সমকামী অধিকার কর্মী দৃষ্টি দে-র বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় লেখা দেয়াল লিখন চোখে পড়েছে। এসব দেয়ালে তাকে দ্রুত গ্রেফতার, নাগরিকত্ব বাতিল এবং ফাঁসির দাবি জানানো হয়েছে। তবে এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি কোন ব্যক্তি বা সংগঠন এসব দেয়াল লিখন করেছে।
রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, শাহবাগ, উত্তরা, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি এবং পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এমন দেয়াল লিখন দেখা গেছে। এছাড়া চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালসহ দেশের অন্যান্য শহরেও অনুরূপ লেখা চিহ্নিত করা হয়েছে।
দেয়ালে লেখা স্লোগানগুলোর মধ্যে রয়েছে: “দেশ ও ইসলামের শত্রু নাস্তিক সমকামী ব্যভিচারকারী ব্লগার দৃষ্টি দে-কে গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তি প্রদান করার জোর দাবি সকল ধর্মপ্রাণ মুসলমানের, আমাদের দাবি মানতে হবে, ফাঁসি দাও দিতে হবে।”, “সমকামী কুলাঙ্গার নাস্তিক ব্লগার দৃষ্টি দে-কে দ্রুত গ্রেফতার করে প্রকাশ্যে ফাঁসি দাও দিতে হবে।”, “বাংলার মাটি হবে না নাস্তিকের ঘাঁটি। নাস্তিক সমকামী ব্লগার দৃষ্টি দে-র বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বাতিল করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে, ফাঁসি দাও দিতে হবে।”, “দেশ ও ইসলামের শত্রু নাস্তিক কুলাঙ্গার ব্লগার দৃষ্টি দে-কে অবিলম্বে গ্রেফতার করে ফাঁসি দাও।”

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত কয়েকদিনে রাতের অন্ধকারে এসব দেয়াল লিখন করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মিরপুরের একজন দোকান মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “গত সপ্তাহ থেকে এলাকার বিভিন্ন দেয়ালে এরকম লেখা দেখা যাচ্ছে। কারা লিখছে তা আমরা জানি না, তবে রাতের বেলা হচ্ছে বলে মনে হয়।”
তথ্য সূত্রে জানা যায়, দৃষ্টি দে দীর্ঘদিন যাবৎ যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন এবং সেখান থেকে অনলাইনে সমকামী অধিকার, মানবাধিকার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, নারী অধিকার এবং নানা সামাজিক ইস্যু নিয়ে লেখালেখি করে আসছেন। তিনি নিজের ব্লগ, বিভিন্ন ম্যাগাজিন এবং ডিজিটাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত লেখা প্রকাশ করেন।
তার লেখালেখির মধ্যে এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাংলাদেশে সমকামিতার বৈধতা, ইসলামী মৌলবাদ এবং ধর্মীয় সংস্কারের মতো বিষয় রয়েছে। তার এসব লেখা বাংলাদেশের রক্ষণশীল ধর্মীয় গোষ্ঠীর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে।
হেফাজতে ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন অতীতে দৃষ্টি দে-সহ একাধিক ব্লগারের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননা ও নাস্তিক্যবাদ প্রচারের অভিযোগ এনে তাদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছে। সংগঠনগুলো মনে করে, এসব ব্লগার বাংলাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানছেন এবং যুব সমাজকে বিপথগামী করছেন।
এদিকে, কয়েকজন স্থানীয় ধর্মীয় নেতা এই দেয়াল লিখনকে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, সমকামিতা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং যারা এর পক্ষে কথা বলেন তারা ইসলামের শত্রু। তবে তারা দেয়াল লিখনের সঙ্গে সরাসরি কোনো সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেননি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই দেয়াল লিখনকে হুমকি ও সহিংসতার প্ররোচনা হিসেবে চিহ্নিত করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এধরনের দেয়াল লিখন ব্যক্তির জীবনের জন্য সরাসরি হুমকি এবং এটি আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কর্তৃপক্ষের উচিত এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।”
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকাশ্যে কাউকে হত্যার হুমকি দেওয়া বা সহিংসতার প্ররোচনা দেওয়া বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে এখন পর্যন্ত পুলিশ বা প্রশাসন এই দেয়াল লিখনের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের দেয়াল লিখন দেশে সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের জন্য ক্রমবর্ধমান অনিরাপত্তার ইঙ্গিত দেয় এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হুমকি সৃষ্টি করে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, এ ধরনের দেয়াল লিখনের খবর পেলে সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ দায়ের করা যেতে পারে এবং তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সমকামিতা আইনত নিষিদ্ধ এবং দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী এর জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। তবে এলজিবিটিকিউ+ অধিকার কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে এই আইন বাতিল এবং সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করে আসছেন।