বিশ্বকাপ মানেই গোল, ট্রফি আর কোটি কোটি ভক্তের আবেগ—তবে এই উৎসবের আরেকটি দিক আছে যা মাঠের বাইরের গল্প বলে। ফিফার বিপুল আয় থেকেই অংশগ্রহণকারী দেশগুলো ছাড়াও বহু সদস্যদেশ ফুটবলের উন্নয়নের জন্য সুবিধা পাচ্ছে। তার ধারায় এখন বাংলাদেশও লাভবান হচ্ছে। এমনকি টুর্নামেন্টে নিজেরা খেলতে না পারলেও এই আর্থিক স্রোত বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)-এর হাতে ধরে দেশের ফুটবলমুখী কর্মসূচিকে এগিয়ে দিচ্ছে।
ফুটবল বিশ্বকাপ ১৯৩০ সালে মাত্র ১৩টি দল নিয়ে শুরু হলেও এখন এটি ৪৮ দলের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা। দলের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিফার আয়ও বেড়েছে, আর তদুপরি বৈশ্বিক পুরস্কারের অর্থও বাড়ছে। এবার ফিফা বিশ্বকাপের জন্য ঘোষণা করেছে রেকর্ড ৮৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রাইজমানি—যা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ৬৫ শতাংশ বেশি।
টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া প্রতিটি দলই বিভিন্ন পর্যায়ের জন্য নগদ অনুদান পাচ্ছে। প্রস্তুতি ক্যাম্প ও যাতায়াত খরচ হিসেবে প্রতিটি দল পেয়েছে ২৫ লাখ মার্কিন ডলার। গ্রুপ পর্বে বিদায় নিলে দলগুলো পেয়েছে আরও ৯ মিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠলে মিলছে ১২ মিলিয়ন, শেষ ষোলোর জন্য ১৬ মিলিয়ন, কোয়ার্টারফাইনালে ২০ মিলিয়ন ডলার। চূড়ান্ত পারফর্ম্যান্স অনুযায়ী চতুর্থ স্থান পায় ২৭ মিলিয়ন, তৃতীয় স্থান ২৯ মিলিয়ন, রানার্স-আপ ৩৩ মিলিয়ন এবং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল পাবে রেকর্ড ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এইবার চ্যাম্পিয়ন দলকে আলাদা চ্যাম্পিয়নশিপ রিংও দেয়া হবে—ট্রফি ও মেডালের পাশাপাশি নতুন আকর্ষণ হিসেবে।
কিন্তু বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় হল পুরস্কারের চুক্তি নয় বরং ফিফার সংগৃহীত আয়ের একটি অংশ ২১১টি সদস্য দেশের ফুটবল উন্নয়নে নিয়মিতভাবে বিতরণ করা হয়। সেই জোরেই বাফুফে প্রতি চক্রে অর্থ পেয়ে থাকে, যা দেশে অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ ও প্রতিভা বিকাশে কাজে লাগানো হচ্ছে।
ফিফা তহবিলের সহায়তায় ঢাকায় দুইটি আধুনিক কৃত্রিম টার্ফ নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলোর একটি স্থাপন করা হয়েছে বীর শ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে এবং আরটি আছে বাফুফে ভবনের পাশে। এই কৃত্রিম ঘাসগুলো অনুশীলন এবং যুবপ্রশিক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে, যা খেলোয়াড় তৈরিতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে।
বাফুফের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যত অর্থায়নের একটি বড় অংশ ব্যয় করা হবে জাতীয় টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের কোচিং, সায়েন্টিফিক ট্রেনিং ও প্রতিভা শনাক্তকরণে নতুন দিগন্ত খোলে। দেশীয় লিগ, কচিকলেবউ রোস্টার এবং জুনিয়র একাডেমিও সুবিধা পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এভাবে বিশ্বকাপের অর্থ শুধু মঞ্চের সাফল্যের পুরস্কার নয়—এটি সদস্যদেশগুলোর ফুটবল ব্যবস্থার ভিত্তি মজবুত করার একটি বড় উৎসও বটে। তাই যখন বিশ্বকাপের ফাইনালে দুইশ্রেষ্ঠ দল ট্রফি ও কোটি কোটি ডলারের জন্য লড়াই করবে, তখন বাংলাদেশও মাঠে না থাকলেও আর্থিক সুবিধার মাধ্যমে ফুটবলের উন্নয়নে নিজেকে শক্ত করা চালিয়ে রাখবে।