জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও গণভোটের রায়কে নস্যাৎ করার সব ধরনের ষড়যন্ত্র ব্যতিরেকে তীব্র হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ যে গণরায় দিয়েছে তা উপেক্ষা করলে সংসদই সমস্যার সমাধান না করলে শেষ সিদ্ধান্ত হবে রাজপথেই।
আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) ঐতিহাসিক ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে জুলাই বিপ্লবের শহীদ পরিবারের সদস্য, আন্দোলনে আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী যোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন।
বক্তব্যের শুরুতে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সংসদের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ ব্যক্ত করে ডা. শফিকুর বলেন, বহু বড়ো বড়ো কথা বলা হলেও তা কাজে রূপ নেয় না। দেশের ১৮ কোটি মানুষ এই সংসদকে মজলুমদের সংসদ হিসেবে দেখেন এবং গভীর প্রত্যাশায় তাকিয়ে থাকেন; কিন্তু জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তা জনগণের বিবেকই বিচার করবে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, জুলাই বিপ্লবের প্রধান দাবি ছিল ফ্যাসিবাদের অবসান, রাষ্ট্রীয় সংস্কার আর পচা ঐতিহ্যের রাজনীতি অতিক্রম করে একটি নতুন ও আশাব্যঞ্জক বাংলাদেশ গঠন করা। এই উদ্দেশ্য এবং জনগণের মনোভাব যাচাইয়ের জন্যই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
গণভোটের বৈধতা ও ফলাফল নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলছেন তাদের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, কেউ বলছেন গণভোট সংবিধানে নেই, কেউ বলছেন ব্যালটের প্রশ্ন বুঝতে চার ঘণ্টা লেগেছে। অথচ মিডিয়ায় ভোটগ্রহণের প্রশ্ন ১৭ দিন আগে থেকেই প্রকাশ করা হয়েছিল। তিনি প্রশ্ন তুলেন—জ্ঞান-বুদ্ধি কি কেবল তাদেরই আছে, বাংলাদেশের ১৮ কোটির নেই? এ ধরনের মন্তব্য দিয়ে জনগণকে অসম্মান করা হচ্ছে।
ডা. শফিকুর আরও বলেন, নির্বাচনের আগে সব রাজনৈতিক দল গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দেওয়ার আহ্বান করেছিল এবং জনগণ প্রায় ৭০ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ দিয়েছে। এখন ৫১ শতাংশের কথা বলে সেই গণরায়কে উপেক্ষা করার চেষ্টা চলছে। ৫১ বড় না ৭০ বড়—এই প্রশ্নই তাদের সামনে রেখে তিনি অনুসন্ধান দাবি করেন। তিনি বলেন, ভোটে সাড়ে তিন ঘণ্টার ব্ল্যাকআউট ও ভোটের হিসাব মিল না হওয়ার ঘটনায় যেসব প্রমাণ ও রাজসাক্ষী পাওয়া গেছে, ইতিহাস তা ন্যায়বিচার করবে।
সংসদে ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি’ গঠনের সিদ্ধান্তকে তিনি তীব্রভাবে নিন্দা করে বলেন, সংবিধানে বা কোনো বিধিতে এমন কোনো কমিটির অস্তিত্ব নেই। তার বক্তব্য, এটি আসলে জুলাই চেতনা ও গণভোটকে ভুলিয়ে দেওয়ার একটি অবৈধ প্রচেষ্টা; এ কথা জনসম্মুখে বলার আগেই জামায়াত সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে এবং জনগণের রায় রক্ষায় লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিবেশী ভারতের ভূমিকা প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর বলেন, কিছু পক্ষ ভারতের মাটিতে সব দলকে আমন্ত্রণ জানালেও জামায়াতে ইসলামীকে লাল কার্ড দেখানোকে আক্ষেপ করে উল্লেখ করেছে। তিনি তা তুচ্ছভাবে নেন এবং বলেন আমাদের আশ্রয় অন্য কারো বুক নয়—আমাদের আশ্রয় ১৮ কোটি মানুষের অন্তর। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমাদের কোনো ‘পিসি-খালা’ দেশ নেই; একমাত্র দেশ বাংলাদেশ। প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সাথে সৎ ও সম্মানভিত্তিক সম্পর্ক চাই, কিন্তু পররাষ্ট্রনীতি কোনো বহিরাগত ডিক্টেশনে চলে না—সেটা জনগণের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে।
শহীদ পরিবারগুলোর প্রতি সংহতি প্রকাশ করে তিনি জানান, শহীদদের পিতাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যা শুধু তাদের নয়, পুরো জাতির প্রতি অবিচার। জামায়াত শুরু থেকেই শহীদ ও আহত পরিবারের পাশে রয়েছে এবং থাকবে; তারা আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে ভয় পায় না।
আন্দোলনে আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীদের পুনর্বাসনে সরকারের অভাবনীয় উদাসীনতার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, রাষ্ট্র যদি এই বীরদের যথাযথ চিকিৎসা ও সহায়তার দায়িত্ব না নেয়, তবে সেই রাষ্ট্র অকৃতজ্ঞ হিসেবে চিহ্নিত হবে। অতীতে অকৃতজ্ঞদের পরিণতি ভালো হয়নি এবং ভবিষ্যতেও পাবে না, বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি জানান, বাজেট অধিবেশনে দু’বার এসবদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি তোলা হয়েছে।
ডা. শফিকুর স্মরণসভায় সরকারের কাছে আরেকটি জোর দাবি জানান—জুলাই সনদের আলোকে শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের নামে বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নামকরণ করতে হবে। এই ন্যায্য দাবি বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত সংসদে এবং সংসদের বাইরেও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
শেষে তিনি বলেন, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা হবে না। ভয়ে আত্মসমর্পণ করে লাভ নেই—বাংলাদেশ ভয়কে পরাজিত করে ২০২৬ সালে এসেছে। আল্লাহর আইনের ভিত্তিতে নির্ভেজাল এবং ন্যায়বিচারের দেশ গড়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।