সরকার তিনবাহিনীর ১৫০ জন অবসরপ্রাপ্ত, অপসারিত এবং বরখাস্ত কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি, বকেয়া বেতন-ভাতা ও বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি উপভোগকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১১৫, নৌবাহিনীর ২১ এবং বিমানবাহিনীর ১৪ জন রয়েছেন।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বুধবার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। প্রতিরক্ষা সচিব মোঃ আশরাফ উদ্দিনের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনটি আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ এ আদেশ বাস্তবায়ন করবে। জারি করা নথিতে প্রত্যেক কর্মকর্তার আগের ও সংশোধিত অবসরের ধরন, অবসরের তারিখ, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি ও প্রাপ্য সুবিধার বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি জারি করা আগের প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে চাকরিজীবনে বৈষম্য ও প্রতিহিংসার শিকার হওয়া এসব কর্মকর্তার আবেদন পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং তিন বাহিনীর সদর দফতর পৃথক পর্ষদ গঠন করে প্রাথমিক তদন্ত করেছে। পরে ৩ মে প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি বিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবঃ) আব্দুল হাফিজের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশ ও তিন বাহিনীর মতামত বিবেচনায় নিয়ে সরকার এই প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
নথি অনুযায়ী, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক বা অকালীন অবসর বাতিল করে বয়সসীমা পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত চাকরি বহাল রেখে ‘স্বাভাবিক অবসর’ হিসেবে সংশোধন করা হয়েছে। অনেককে ভূতাপেক্ষ (রেট্রোঅ্যাকটিভ)ভাবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল, মেজর জেনারেল, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও কর্নেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, ফলে সংশ্লিষ্ট পদমর্যাদায় চাকরির মেয়াদ পর্যন্ত বকেয়া বেতন-ভাতা ও বিধি অনুযায়ী অন্যান্য আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হবে।
কয়েকজনের ক্ষেত্রে বিশেষ আর্থিক ও প্রশাসনিক সুবিধাও অনুমোদন করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কারও জন্য এককালীন ৫০ লাখ টাকা এবং কারও জন্য সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা পর্যন্ত বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বয়স ও যোগ্যতাসাপেক্ষে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পদায়নের সুযোগও রাখা হয়েছে।
কিছু উদাহরণ উল্লেখ করা হল:
– মেজর জেনারেল সৈয়দ ফাতেমী আহমেদ রুমী: তাঁকে ২০০৯ সালের ১২ মার্চ বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্তে তার অবসর সংশোধন করে ২৫ আগস্ট ২০১৩ পর্যন্ত স্বাভাবিক অবসর হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফলে ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত মেজর জেনারেল পদমর্যাদায় বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা তিনি পাবেন।
– ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী: ২০০৯ সালের ২৪ জুন তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। প্রজ্ঞাপনের অনুযায়ী তাকে ২৬ ডিসেম্বর ২০১১ তারিখে ভূতাপেক্ষ মেজর জেনারেল এবং ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও মেজর জেনারেল—উভয় পদে বকেয়া বেতন-ভাতা, বিধি অনুযায়ী অন্যান্য আর্থিক সুবিধা, এক কোটি টাকা বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা এবং বয়স ও যোগ্যতাসাপেক্ষে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পদায়নের সুযোগ পাবেন।
– ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ আনিসুজ্জামান ভূঁইয়া: তাঁকে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে স্বাভাবিক অবসর দেওয়া হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্তে তাকে ভূতাপেক্ষ মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে ২০১৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, ফলে ওই দুই বছরের মেজর জেনারেল পদমর্যাদার বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা প্রদান করা হবে।
– রিয়ার অ্যাডমিরাল মোস্তাফিজুর রহমান (নৌবাহিনী): তাঁকে ২০১০ সালের মার্চে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্তে তাঁর চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৫ সালে স্বাভাবিক অবসর দেখানো হয়েছে, ফলে অতিরিক্ত পাঁচ বছরের বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন তিনি।
– এয়ার ভাইস মার্শাল মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন (বিমান বাহিনী): ২০০৯ সালে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্তে তাঁর চাকরির মেয়াদ ছয় বছর বাড়িয়ে ২০১৫ সাল পর্যন্ত গণ্য করা হয়েছে, ফলে ওই সময়ের বকেয়া বেতন-ভাতা ও বিধিমতো অন্যান্য সুবিধা প্রদান করা হবে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সিদ্ধান্তটি জনস্বার্থে নেয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বাহিনী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পর্যায়ের যাচাই-বাছাই শেষে প্রত্যেক কর্মকর্তার ক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নথিতে প্রত্যেক কর্মকর্তার সংশোধিত অবসরের ধরন, তারিখ, পদোন্নতি ও প্রাপ্য সুবিধার বিশদ তালিকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।