ইউরোপে বিধ্বংসী দাবদাহ ছড়িয়ে পড়ায় স্পেন ও ফ্রান্সে মৃত্যু ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, আর জার্মানি, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসে তাপমাত্রা জুনের আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। উত্তর ও পূর্ব দিকে ধেয়ে আসছে এই তীব্র গরম—এতে জনজীবন, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও পরিবেশ পুরোপুরি ব্যহত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ বহু কনসার্ট, ম্যারাথন ও বড় অনুষ্ঠান বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে তাপদাহের কারণে সারাদেশে জরুরি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে যাতে কমজোর ও বয়স্করা নিরাপদে রাখা যায়।
স্পেনের মোমো মনিটরিং সিস্টেম জানিয়েছে, দাবদাহের কারণে দেশটিতে অন্তত ৩২৭ জনের মৃত্যু ঘটেছে। একই সঙ্গে বার্সেলোনার কাছে একটি বনে ভয়াবহ আগুনের ফলে প্রায় ১৬ হাজার মানুষকে ঘরে রাখা বা ঘরের ভেতরেই থাকার নির্দেশ দিতে হয়েছে।
ফ্রান্সে তীব্র গরমের প্রভাবে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কায় প্যারিসের সব হাসপাতালেই জরুরি পরিকল্পনা চালু করা হয়েছে। চলমান দাবদাহের মধ্যে গরম গাড়ির ভেতরে আটকে থেকে কয়েকজন শিশুর মৃত্যু報ে দেখা দিয়েছে। এছাড়া, অনিরাপদ এলাকায় সাঁতার কাটার চেষ্টা করে পানিতে ডুবে গেলে দাবদাহ শুরুর পর থেকে ফ্রান্সে ৫৫ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। ফ্রান্সের স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট জানিয়েছেন, এখন হাসপাতালে রোগীর ভিড়কেও ছাড়িয়ে বাড়িতে আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনা বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সারব্রুকেনে ৪১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। বেলজিয়ামের ক্লাইন ব্রোগেলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছুঁয়েছে এবং নেদারল্যান্ডসের লিমবার্গে সর্বোচ্চ ৩৯.৪ ডিগ্রি নথিভুক্ত হয়েছে। যুক্তরাজ্যের সাফোকের ক্যাভেন্ডিশে ৩৭.১ ডিগ্রি রেকর্ড করা হয়েছে। শুক্রবার পুরো ইউরোপ মহাদেশে অন্তত ১৫ কোটি মানুষ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপের মুখোমুখি হয়েছে।
চেক আবহাওয়াবিদরা বলছেন, দাবদাহটি আরো উত্তর ও পূর্ব দিকে ছড়াতে পারে—তাই ২০১২ সালে মেপে রাখা ৪০.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ডও ভাঙার সম্ভাবনা রয়েছে। অস্ট্রিয়াও রেকর্ড ভাঙার সম্ভাবনা জানিয়েছে, আর বলকান অঞ্চলেও তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে; সার্বিয়ায় সপ্তাহান্তে ৩৯ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছানোর পূর্বাভাস আছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মুখপাত্র ক্লেয়ার নুলিস সতর্ক করেছেন যে এই চরম পরিস্থিতির সঙ্গে আমাদের মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে এবং এর প্রধান কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের বিজ্ঞানীরা বলছেন, একটি স্থায়ী উচ্চ-চাপ বলয়ের (হিট ডোম) কারণে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন ও দক্ষিণ ইংল্যান্ডে তাপমাত্রা মৌসুমের স্বাভাবিক গড়ের চেয়ে ৫ থেকে ১২ ডিগ্রি বেশি উঠেছে। কপর্ণিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসও জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইউরোপ দ্রুতভাবে উত্তপ্ত হচ্ছে—এটি বৈশ্বিক দ̊ড়ার চেয়ে দ্রুত উষ্ণতর।
চরম গরমের প্রভাব বিদ্যুৎ অবকাঠামোতেও পড়েছে। সুইজারল্যান্ডের বেজনউ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি রিয়্যাক্টর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কারণ নদীর পানি তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা রিয়্যাক্টর ঠান্ডা করার জন্য অপর্যাপ্ত।
পরিবহনে বড় ক্ষতি: কোলন থেকে প্যারিসগামী একটি ইউরোস্টার ট্রেন ব্রাসেলসের কাছাকাছি ভাঙনের ফলে প্রায় ৪০০ যাত্রী আটকে পড়ে, তিন যাত্রীকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে প্যারিসে হাসপাতাল ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়ে এবং স্থানীয় প্রশাসন প্যারিস প্রাইড মার্চ ও কয়েকটি মিউজিক ফেস্টিভালসহ বড় আয়োজন বাতিল করেছে। জার্মানিতেও ম্যারাথনসহ বহু কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে; তবে প্যারিসের শার্লেটি স্টেডিয়ামের ডায়মন্ড লিগ অ্যাথলেটিকস মিট তখনই আয়োজন করার অপেক্ষায় ছিল যখন বিকালের দিকে রোদের তীব্রতা কমে।
প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্যও কোনো দিন করা যাচ্ছে না: সুইজারল্যান্ডের হিমবাহ গবেষকরা জানিয়েছে, গরমের ফলে এই সপ্তাহের শুরু থেকেই হিমবাহ পিঘলতে শুরু করবে—সাধারণত এই গলন প্রক্রিয়া আগস্টে শুরু হয়। ২০২২ সালের পর এবার হিমবাহ গলনের গতিই সবচেয়ে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সংক্ষেপে, চলমান দাবদাহ শুধু তাপমাত্রা নয়—এটি মানবজীবন, অবকাঠামো, পরিবেশ ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তার ওপর সুচল প্রভাব ফেলছে। কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকায় এবং তাত্ক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণে জোর দেওয়া হচ্ছে যেন আরো প্রাণহানির ঘটনা আটকানো যায়।