পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছেন, রাজ্য পুলিশ যারা ‘কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহ করে তাদের গ্রেপ্তার করে সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দেবে এবং বিএসএফ পরে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। এই ঘোষণার পর প্রশ্ন উঠেছে—এটি এতদিনের আইনি প্রক্রিয়ার থেকে কতটা আলাদা এবং কি ধরনের আইনি-মানবাধিকারগত জটিলতা তৈরি হতে পারে?
চলতি আইনি প্রক্রিয়া কেমন
আইন অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক যদি ভারতে অবৈধভাবে প্রবেশ করে ধরা পড়ে, তবে তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে তোলা হয়। বিদেশি আইনের ১৪এ ধারার অনুচ্ছেদে মামলা দায়ের করা হয় এবং বিচার শেষে আদালত সাজা নির্ধারণ করে। সাজা সম্পন্ন হলে কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে রাজ্য সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাগরিকত্ব ও ঠিকানার বিষয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওই ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মাধ্যমে বাংলাদেশে হস্তান্তর করে।
অফ-রেকর্ড পদ্ধতি: পুশ-ব্যাক
আইনের বাইরে আরও একটি প্রথা অসতর্কভাবে চলে এসেছে—‘পুশ-ব্যাক’ বা সীমান্তে গোপনে ফিরিয়ে দেওয়া। এই পদ্ধতিতে বিচার প্রক্রিয়া বাইপাস করে আটক ব্যক্তিদের সীমান্তের ওপরেই নিকটস্থ সীমান্ত পেরিয়ে ঠেলে দেয়া হয়। গত এক বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে অনেকে এভাবে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে পরে প্রমাণিত হয়েছে অনেকে ভারতেরই বৈধ নাগরিক ছিলেন। যদিও বিএসএফ আনুষ্ঠানিকভাবে এটি স্বীকার করে না, তদন্তে কিংবা স্থানীয় সূত্রে এ ধরনের কাজের কথাই সামনে আসে।
সরকারি নির্দেশিকা এবং রাজ্যের পদক্ষেপ
গত বছর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি গোপন নির্দেশিকা জারি করে, যেখানে সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের কীভাবে তাদের দেশে পাঠাতে হবে, সে ধারা ছিল বলে জানা যায়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সেই নির্দেশিকার উল্লেখ করে বলেছেন যে ১৪ মে, ২০২৫ তারিখে কেন্দ্র একটি নির্দেশিকা পাঠিয়েছিল—যা, তার ভাষ্য, মূলত ‘পুশ-ব্যাক’ পদ্ধতির অনুরূপ। নবগঠিত রাজ্য সরকারের তৎপরতায় এখন থেকে এই নিয়ম কার্যকর করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
নবান্নে সভা ও বিএসএফ-কে জমি হস্তান্তর
শুভেন্দু নবান্নে বিএসএফ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া তৈরির জন্য জমির একটি অংশ বিএসএফকে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ওই বৈঠকে তিনি বারবার অনুপ্রবেশকারীদের প্রসঙ্গ তুলেছেন এবং রাজ্য পুলিশকে সরাসরি বিএসএফের হাতে হ্যান্ডওভার করার কথাও জানিয়েছেন।
আসাম মডেল ও ‘ডিটেক্ট–ডিলিট–ডিপোর্ট’
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং কেন্দ্রীয় নেতারা আগে থেকেই এই ধরনের কড়া পদক্ষেপের পক্ষে কথা বলেছেন। আসামে যে পদ্ধতি চালু হয়েছে—বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত হলে দ্রুত সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়া—তাকেই পশ্চিমবঙ্গেও গ্রহণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বক্তব্য ছিল—‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’: প্রথমে শনাক্ত, তারপর তালিকা থেকে নাম বাদ, অবশেষে প্রত্যর্পন।
সিএএ এবং লক্ষ্যভিত্তিক অভিযোগ
মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, যারা সিএএ (নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন)-এর আওতায় পড়বে তাদের পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারবে না; কিন্তু সিএএ-এর বাইরে যারা থাকবেন, তাদের ‘পুরোপুরি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে দেখা হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে এই প্রক্রিয়া চালু হবে। এই ঘোষণায় অনেকেই বলছেন এতে মূলত মুসলিম সম্প্রদায়কেই লক্ষ্য করা হচ্ছে, কারণ সিএএ-র আওতায় থাকা সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে মুসলিম নেই। তাই ওই ঘোষণা সাম্প্রদায়িকভিত্তিক ভীতি বাড়াতে পারে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আইনি ও মানবাধিকার উদ্বেগ
মানবাধিকার সংগঠন এবং বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন, বিচার প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে কাউকে সীমান্তে ঠেলে দেয়া সংবিধানবিরোধী ও স্বাধীনতার লঙ্ঘনজনক হতে পারে। দেশের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘মাসুম’-এর প্রধান কিরীটি রায় বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাব আইন ও আদালতকে উপেক্ষা করছে। তিনি মনে করান, আগে মহারাষ্ট্র, গুজরাট, ওড়িশা, রাজস্থান থেকে যারা ঠেলে দেওয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে অনেকেই পরে প্রমাণিত হয়েছিল যে তারা ভারতীয় নাগরিক; এসব নিয়ে সুপ্রিম কোর্টেও মামলা হয়েছে।
বিশ্লেষক মন্তব্য
দিল্লির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. উপমন্যু বসু মনে করেন, এখানে আসামের মডেলই পশ্চিমবঙ্গ অনুকরণ করছে। রাজনৈতিক ইশতেহারে প্রতিশ্রুত পদ্ধতিগুলো এখন ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হচ্ছে—বিএসএফকে জমি দেওয়া শুরু হয়েছে এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখতে পদক্ষেপ নেবে বলে জানানো হয়েছে। তিনি সতর্ক করেছেন, যদিও অবৈধ অনুপ্রবেশ যে কোনো দেশের জন্য গুরুতর সমস্যা, তবু নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে পদক্ষেপ নিলে সেটি বিভাজক ও অসাম্যের কারণ হতে পারে।
পরিস্থিতির সারমর্ম
শুভেন্দু প্রশাসনের এই ঘোষণা—রাজ্য পুলিশকে সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের গ্রেপ্তার করে সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ—বাস্তবে কি ভাবে অনুসরণ করা হবে এবং তার আইনি প্রভাব কী হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। আচরণগতভাবে এটি শর্ট-ট্র্যাক মোকাবেলায় কার্যকর মনে হলেও আদালত, মানবাধিকার সংগঠন ও স্থানীয় প্রতিবাদীদের উদ্বেগ উপেক্ষা করলে বৃহত্তর সামাজিক ও ন্যায়িক অনৈতিকতার জন্ম দিতে পারে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা