সবকিছু যেন শেষ হয়ে গিয়েছিল—স্কোর ২–০, সময় এগিয়েছে ৬৭ মিনিটে। প্রথমার্ধে লিওনেল মেসির পেনাল্টি মিস, আর মিসরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর ছিলেন অবরোধের প্রতীক। সেই মুহূর্তে আর্জেন্টিনার বিদায় নির্ধারিত মনে হচ্ছিল। কিন্তু বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের গল্প সহজে লেখা হয় না।
অ্যাটলান্টা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত রাউন্ড অব ১৬-এর লড়াইয়ে লিওনেল স্কালোনির দল ইতিহাস রচনায় সক্ষম হল—২–০ থেকে মাত্র ১৩ মিনিটে তিন গোল করে ৩–২ রান করে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গেল আর্জেন্টিনা।
ম্যাচের শুরু থেকেই মিসর আক্রমণে আক্রমণে গতি দিল। ম্যাচের ১৫ মিনিটে মারাওয়ান আতিয়ার নিখুঁত ক্রস থেকে ইয়াসির ইব্রাহিমের হেডে এগিয়ে যায় আফ্রিকান দলটি। আঘাত পেয়েও ছন্দ ফিরে পেতে শুরু করে আর্জেন্টিনা; ২১ মিনিটে তাদের কাছে আসে পেনাল্টি। তবে মেসির স্পটকিক ডান দিকে ঝাঁপিয়ে আটকিয়ে নেন শোবেইর। পরবর্তী সুযোগগুলো—আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টারের হেড, মেসির ফ্রি-কিক, জুলিয়ান আলভারেজের শট—সবই শোভেইরের প্রতিভায় আটকে যায়; এমনকি একবার মেসির ফ্রি-কিক পোস্টে লেগে ফিরে আসে।
বিরতির পরও বলটা বেশি ছিল আর্জেন্টিনার পায়ে, কিন্তু গোলের বিচ্ছুতা মিসরের দখলে থাকল। ৬৭ মিনিটে আর্জেন্টিনার কর্নার থেকে শুরু হওয়া গতি ধরে মিসর একটি ব্যয়বহুল কন্ট্রা আক্রমণে ওঠে—মহাম্মদ সালাহ মাঝমাঠ থেকে বল বাড়িয়ে দেন হাইসেম হাসানের দিকে, ডান থেকে আসা নিচু ক্রসে ছয় গজে মোস্তাফা জিকো সহজেই বল জালে পাঠান এবং ব্যবধান দ্বিগুন করে দেন। গ্যালারিতে তখন আর্জেন্টাইন অনুরাগীদের বোবা নীরবতা।
স্কালোনি তখন পরিবর্তনে লাউতারো মার্তিনেস ও নিকো গনসালেস নামান—আর সেই বদলিই ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়। চাপ বাড়তে থাকে মিসরের উপর, আক্রমণের সারি শুরু হয় আর্জেন্টিনার।
৭৯ মিনিটে মেসির এক দারুণ ক্রসে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর শক্তিশালী হেডে ব্যবধান কমে ২–১। সেই অ্যাসিস্টটি মেসিকে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৯টি অ্যাসিস্টে উঠিয়ে দেয় এবং দিয়েগো ম্যারাডোনার রেকর্ডও অতিক্রম করে।
চার মিনিট পর খেলা পুরোপুরি উল্টে যায়। মিসরের রক্ষণ বল পুরোপুরি সরাতে না পারায় গনসালো মন্তিয়েল বল মেসির দিকে পাঠান; মেসির প্রথম ছোঁয়ার শট শোবেইর স্পর্শ করেও ক্রসবারে লেগে জালে ঢুকে যায়—২–২। প্রথমার্ধের পেনাল্টি মিস যেন এক ঝটকায় ভুলে গেল পুরো স্টেডিয়াম, আর মেসি বিশ্বকাপে তাঁর অষ্টম গোল করে ফেললেন।
যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে মিসর আবার বিপজ্জনক কন্ট্রা আক্রমণে ওঠে, কিন্তু লিয়ান্দ্রো পারেদেসের চক্করানো ট্যাকল বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বাঁচায়। আর ঠিক এক মিনিট পরই আসে নাটকীয় সমাপ্তি। লাউতারো মার্তিনেসের বাড়ানো বল বক্সে ঢুকে হেডে জাল খুঁজে পান এনসো ফের্নান্দেস—সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্যভাবে আর্জেন্টিনা ২–০ থেকে ৩–২ এগিয়ে যায়। সেই জয়টি ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসে আর্জেন্টিনার ৩ হাজারতম গোলও।
এই ম্যাচটি ছিল হার না মানার, শেষ সিগন্যাল পর্যন্ত বিশ্বাস রাখার উদাহরণ। কেন্দ্রে ছিলেন লিওনেল মেসি—একটি গোল, একটি অ্যাসিস্ট, একটি পেনাল্টি মিস এবং নেতৃত্বের মাধ্যমে দলকে খাদের কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনা তার এক মহাকাব্যিক সন্ধ্যা।