মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা অস্থিতিশীলতার কারণে শান্তি ফেরাতে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং চারটি মূল প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী অভিযান ও উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে এসব প্রস্তাব এসেছে, যাতে আঞ্চলিক স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের গুরুত্বকে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
চীন প্রতিরক্ষা ও কূটনীতি নিয়ে এক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং অফিসিয়ালি যাচাই করা এক্স-handle থেকে এই চার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সি চিনপিং যেসব মূল নীতির ওপর জোর দিয়েছেন, সেগুলো হলো—
১) শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখা: মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোকে পরস্পরের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে দেখে চীন বলেছে, তারা বিচ্ছিন্নভাবে চলতে পারবে না। পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে প্রো-অ্যাকটিভ উদ্যোগ এবং একটি সর্বাত্মক, সহযোগিতামূলক ও টেকসই নিরাপত্তা কাঠামো গড়া জরুরি।
২) জাতীয় সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখা: সার্বভৌমত্বকে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে মানতে হবে এবং তা লঙ্ঘন করা যাবেনা। উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং তাদের জনবল ও অবকাঠামো রক্ষায় সম্মান দেখানো প্রয়োজন।
৩) আন্তর্জাতিক আইনের শাসন মেনে চলা: জাতিসংঘকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ও আইনের ওপর ভিত্তি করে আর্থ-রাজনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনা করা উচিত। জাতিসংঘ সনদের আদর্শ ও লক্ষ্যকে গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুনের প্রতি অটল থাকা জরুরি।
৪) উন্নয়ন ও নিরাপত্তার ভারসাম্য রক্ষা করা: নিরাপত্তা ও উন্নয়ন পরস্পরের পরিপূরক। উপসাগরীয় দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং সব পক্ষকে ইতিবাচক ভূমিকা নিতে হবে। চীন এই প্রক্রিয়ায় সহায়তা এবং নিজস্ব আধুনিকায়নের সুযোগ ভাগ করে নেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
প্রস্তাবগুলোর পাশাপাশি সাম্প্রতিক ঘটনাও নজর কাড়ছে — মার্কিন নৌ-অবরোধের কিছুক্ষণ পর হরমুজ প্রণালী পার করে বাহিরে বেরিয়ে এসেছে চীনের একটি ট্যাংকার। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞায় থাকা ওই চীনা তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে উপসাগরীয় জলসীমা ছাড়িয়ে গেছে। রয়টার্স সূত্রে জানানো হয়েছে, এই তথ্য এসেছে LSEG, MarineTraffic ও Kpler-এর ডেটা থেকে।
জাহাজটির নাম রিচ স্ট্যারি এবং এর মালিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বলা হয়েছে সাংহাই শুয়ানরুন শিপিং কোম্পানি লিমিটেডকে। জাহাজটি আগে ইরানের সঙ্গে লেনদেনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ছিল। সংবাদের মতে, জাহাজটি সর্বশেষ সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামরিয়াহ বন্দরে নোঙর করে পণ্য তোলা ছিল।
রয়টার্স আরও জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞায় থাকা আরেকটি জাহাজ মুরলিকিশান বর্তমানে প্রণালিতে প্রবেশ করেছে এবং এটি ১৬ এপ্রিল ইরাকে অপরিশোধিত তেল তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, পূর্বে এমকেএ নামে পরিচিত এই জাহাজটি রাশিয়া ও ইরানের তেল পরিবহন করেছে।
চীনের ইরানি তেল ক্রয়ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সময়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির সূচক ছিল। শত্রুতা শুরুর আগেও ইরানের রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ চীনই ক্রেতা ছিল। শিপিং ডেটা ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান Kpler-এর তথ্যমতে, গত বছর চীন দিনে গড়ে প্রায় ১৩.৮০ লক্ষ ব্যারেল (প্রতি দিন 1.38 মিলিয়ন ব্যারেল) ইরানি তেল আমদানি করেছিল। একই সময়ে চীন সমুদ্রপথে আমদানি করা তেলের প্রায় ১৩.৪ শতাংশই ইরান থেকেই আসে।
এই সব ঘটনা দৃশ্যমানভাবে দেখাচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক নীতি— উভয় ক্ষেত্রেই কড়া প্রতিযোগিতা চলমান। সি চিনপিংয়ের প্রস্তাবগুলি আঞ্চলিক সংলাপ ও কূটনৈতিক পথ পুনরুজ্জীবিত করতে চায়, আর তেল শিপিংয়ে চলমান গতিবিধি তাৎপর্যপূর্ণভাবে ভবিষ্যৎ শক্তি ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে।