ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আজ থেকে শুরু হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আজ বেলা ১১টায় উদ্বোধনী ভাষণ দেবেন। রাষ্ট্রপতির ভাষণ মন্ত্রিসভা অনুমোদন করবে এবং এরপর সংসদ সদস্যরা বিতর্কে অংশ নেবেন।
পটভূমি: ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দেন। সেই থেকে সংসদে কোনও অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়নি। এখন নির্বাচিত সদস্যদের মাধ্যমে শুক্রবার থেকে সংসদের কার্যক্রম পুনরায় শুরু হচ্ছে। এ অধিবেশনটিই ২০২৬ সালের প্রথম অধিবেশনও বটে।
রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ক্ষমতাবলে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি এই প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন। অধিবেশন শুরুর আগে সংসদের কার্যপ্রণালী নির্ধারণের জন্য সংসদীয় কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে অধিবেশনের সময়কাল ও এজেন্ডা চূড়ান্ত হবে। সরকারি দলের (ট্রেজারি বেঞ্চ) প্রথম কাজ হবে সরকার যে সব অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করাতে চায় সেগুলো সংসদের সামনে উপস্থাপন করা। গত ১৮ মাসে অন্তর্বতীকালীন সরকার মোট ১৩০টি অধ্যাদেশ জারি বা সংশোধন করেছিল।
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের ফলাফল গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করতে হয়; এ আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শের ওপর ভিত্তি করে হয়। ত্রয়োদশ সংসদের নির্বাচনী কার্যক্রম গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়ে ১৩ ফেব্রুয়ারি ২৯৭টি আসনের ফল গেজেট প্রকাশিত হয়। তাতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয়ী হয়েছে; এর মধ্যে বিএনপি একাই পেয়েছে ২০৯টি আসন। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৬টি আসন, যার মধ্যে জামায়াতে ইসলামী একাই পেয়েছে ৬৮টি আসন। পরে ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন এবং একই দিন বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে; দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
নেতৃত্ব ও সভাপতিত্ব: নতুন সংসদে বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংসদ নেতা ও জামায়াতে ইসলামের আমির ডাঃ শফিকুর রহমান বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তবে উদ্বোধনী অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন, তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে—কারণ দ্বাদশ সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করে আত্মগোপনে আছেন এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু বিভিন্ন মামলায় কারান্তরীণ অবস্থায় রয়েছেন। সাধারণত নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিদায়ী সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারই সভাপতিত্ব করেন এবং তাদের উপস্থিতিতে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়। কিন্তু বর্তমানে দু’জনেই দায়িত্ব পালনের অবস্থায় না থাকায় বিকল্প প্রক্রিয়া গ্রহণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
বৈঠক ও সিদ্ধান্ত: ক্ষমতাসীন দল বিএনপি’র সংসদীয় দলের এক বৈঠকে উদ্বোধনী দিন কীভাবে অধিবেশন পরিচালনা হবে তা নির্ধারণ করা হয়েছে। বৈঠকের পর বিএনপি’র চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম জানান, উদ্বোধনী অধিবেশনে স্পিকারের চেয়ার খালি রেখে অধিবেশন শুরু করা হবে। শুরুতে কোরআন তেলাওয়াতের পর সংসদ নেতা একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যকে সভার অস্থায়ী সভাপতির জন্য প্রস্তাব করবেন; অন্য এক সদস্য এটি সমর্থন করলে ওই জ্যেষ্ঠ সদস্য সাময়িকভাবে অধিবেশন পরিচালনা করবেন। তার পরিচালনায় নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হবে এবং শপথ গ্রহণের পর তারা অধিবেশনে স্থায়ীভাবে সভাপতিত্ব করবেন। শপথগ্রহণের জন্য অধিবেশনটি ১৫–২০ মিনিটের জন্য মুলতবি করা হতে পারে। সংসদীয় সূত্রে বলা হচ্ছে, জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য হিসেবে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম আলোচনায় রয়েছে।
সংবিধান ও বিশেষজ্ঞ মতামত: সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রথম বৈঠকেই সদস্যদের মধ্য থেকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করার বিধান রয়েছে। আর সংবিধানের ৭২(৬) অনুচ্ছেদ বলে, নতুন স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত বিদায়ী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার পদে বহাল থাকেন বলে গণ্য হবেন। বর্তমান বাস্তবতায় তা প্রযোজ্য না হওয়ায় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির আলোকে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। সংসদীয় রাজনীতি নিয়ে গবেষক অধ্যাপক ড. কে এম মহিউদ্দিন বলেন, সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দায়িত্বে থাকেন, কিন্তু বর্তমানে উভয়ের অনুপস্থিতিতে শূন্যতা দেখা দিয়েছে। তিনি যোগ করেন, কার্যপ্রণালী বিধি ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ব্যবহার করে উদ্বোধনী অধিবেশন পরিপাটি করে পরিচালনার পথ খোঁজা সম্ভব।
উপসংহার: প্রথম অধিবেশনটি দেড় বছরের অন্তর্বতী সরকারের পর দেশের নির্বাচিত সরকারের অধীনে সংসদীয় কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করার দিন হিসেবেই গুরুত্ব বহন করছে। উদ্বোধনী দিনে কোথা থেকে এবং কার নেতৃত্বে কাজ শুরু হবে—সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দ্রুত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের নির্বাচনের মধ্যদিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রমে ঢুকবে।