প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের যথাযথ মূল্যায়ন ও পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। শহীদদের আত্মত্যাগ ও আহতদের কষ্টকে সম্মান জানানো এবং তাদের পরিবারদের জীবনমান নিশ্চিত করা সরকারকে ঋণ—এমনটাই তার বক্তব্য।
আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শনিবার দুপুরে অনুষ্ঠিত জুলাই জাতীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শহীদদের স্মরণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘‘জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগ ও আহতদের অবদান চিরস্মরণীয় রাখা হবে। তাদের জন্য সরকার সর্বোচ্চ সম্মান ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তাদের পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন নিশ্চিত করা হবে।’’
বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, ‘‘জুলাই শহীদদের হত্যাকারীদের বিচার এই দেশের আইনে এ দেশেই হবে। আপনাদের বিরুদ্ধে যেসব অন্যায় হয়েছে, যেভাবে আপনজনকে হত্যা করা হয়েছে—তার সম্পর্কে দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করা হবে।’’
তিনি অনুষ্ঠানে এক মানবিক মুহূর্তের বর্ণনায় বলেন, ‘‘আমি বারবার ভাবছিলাম—এই মুহূর্তে যদি আমি আমার মাকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম, তিনি কি চান আমি প্রতিশোধ নিই? আমার মা বলতেন, তোমার কাজ হবে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশকে এগিয়ে নেয়া। আমার ভাইও হয়ত একই উত্তর দিতেন।’’ এই কথায় উপস্থিত অনেকের চোখ ভিজে ওঠে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘জুলাই আন্দোলনে যে কষ্ট-যন্ত্রণা আপনাদের ভোগ করতে হয়েছে, আমি তা অনুভব করি। শারীরিক বা মানসিক যে যন্ত্রণা—আমি চেষ্টা করছি তা বোঝার এবং সহায়তা করার।’’ তিনি স্বৈরাচ্যের সময়ে থেকে শুরু করে ৫ আগস্ট পর্যন্ত চলা আন্দোলনে লক্ষ লক্ষ মানুষের নির্যাতন ও শারীরিক কষ্টের কথাও স্মরণ করেন।
জুলাই আন্দোলনকে দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে সংগ্রাম বলে অভিহিত করে তিনি বলেন, ‘‘৫ আগস্ট যে অর্জন আমরা পেয়েছি, তা কোনো একক ব্যক্তি বা দলের নয়—এটি বাংলাদেশের প্রতিটি গণতন্ত্রপ্রেমীর সম্মিলিত ত্যাগের ফসল।’’ তিনি উল্লেখ করেন, জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী ৬৫ জন শিশু ওই সময়ে শহীদ হয়েছে; তাদের কোনো অপরাধ ছিল না—তারা শুধু দেশের জন্য প্রাণ হারিয়েছে।
স্মৃতিচারণের সময় প্রধানমন্ত্রী নিজের গণনাও তুলে ধরে বলেন, সরকারি থাকবে যে সংখ্যা আর জাতিসংঘের রিপোর্টে যে সংখ্যার উল্লেখ আছে—এগুলো আলাদা—তবু তাঁর ধারণা অনুযায়ী শুধু জুলাই আন্দোলনে প্রায় ২ হাজার জন শহীদ হয়েছেন এবং আনুমানিক ৩০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনুষ্ঠানে বলা হয়, সরকারি গেজেটে প্রকাশিত শহীদের তালিকায় ৮৩৪ জন আছে, আর জাতিসংঘের তদন্তে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি নিহত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত শহীদ পরিবারের প্রতি আবেদন জানিয়ে বললেন, ‘‘আপনজন হারানো ব্যথা কখনও সেরে যাবে না। তবু যদি আমরা সবাই মিলে দেশকে এগিয়ে নিতে পারি, একদিন গর্ব করে বলা যাবে—আপনজনের ত্যাগের বিনিময়ে দেশের ভাগ্য বদলেছে। তাই আজ আমাদের প্রধান কাজ শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা।’’
সম্মেলনে শহীদ পরিবারের হাতে প্রধানমন্ত্রী স্মৃতি স্মারক তুলে দেন। শহীদ মিরাজের বাবা রব মিয়া, শহীদ সেলিমের ভাই উজ্জ্বল হোসেন, আহত আল মিরাজ ও জেলার অন্যান্য শহীদ পরিবার প্রতীকী স্মারক গ্রহণ করেন। পরে উপস্থিত সবার জন্য রাখা স্মৃতি স্মারকও পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। শহীদ পারিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকেও স্মারক উপহার দেয়া হয়।
সম্মেলনটি ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ ও ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়ন মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনসহ রাজনীতিক ও দলীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন। স্থানীয়ভাবে আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যরাও তাদের স্মৃতি ও যন্ত্রণা শেয়ার করেন।
অনুষ্ঠানটি কোরআন তিলাওয়াত, শহীদদের স্মরণে দোয়া-মোনাজাত, জাতীয় সংগীত ও জুলাই আন্দোলনের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। মঞ্চে ব্যানারে লেখা ছিল—‘গর্বিত ইতিহাস, অদম্য চেতনা’ এবং এই দিনের আত্মত্যাগকে আগামী প্রজন্মের জন্য প্রেরণা হিসেবে দেখার আহ্বান জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রীর আবেদন ছিল—জাতিকে বিভক্ত করে এগোয়ানো যাবে না; শহীদদের ত্যাগকে সম্মান জানাতে হলে তাদের স্বপ্নে বিশ্বাস করে দেশকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার সভ্য ও আইনি পথে শহীদ ও আহতদের দাবি মেনে পুনর্বাসন ও সহায়তা নিশ্চিত করবে, এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।