যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার চার মাস পর ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে আশা করা হচ্ছে এতে প্রায় দুই কোটি মানুষ অংশ নেবে। বিশাল এই জনসমুদ্রে খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশটি এই অনুষ্ঠানের জন্য পাঁচ কোটি রুটি তৈরির প্রস্তুতি নিয়েছে।
ইরানের আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ জানিয়েছে, শোকাকুল মানুষের জন্য ১৬টি ভ্রাম্যমাণ বেকারিসহ মোট পাঁচ কোটি রুটি তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া জরুরি সেবা হিসেবে দুই হাজার পাঁচশোটি অ্যাম্বুলেন্স, ২১টি হেলিকপ্টার, শতাধিক ড্রোন এবং প্রায় ২০ হাজার ক্লাসরুম আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তেহরানের প্রধান সড়কগুলোতে প্রচন্ড ভিড় ও যানজট ঠেকাতে ইতিহাসসর্বোচ্চ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নেওয়া হয়েছে—এপ্রসঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল সীমিত বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জুলাইয়ের তীব্র গরম মাথায় রেখে মোসল্লা কমপ্লেক্সের চত্বর ও আশেপাশে ছাদে ছয় হাজারের বেশি পানি স্প্রিঙ্কলার বসানো হয়েছে যাতে মানুষের বর্জ্য গরম ও পানির চাহিদা মেটানো যায়।
ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এই বন্দোবস্ত দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ এক ‘বিদায় অনুষ্ঠান’ হবে এবং এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের টিকে থাকার ও প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রদর্শন করা হবে। তবু এত বিশাল আয়োজনের ফলে তেহরানের সাধারণ নাগরিকেরা ট্রাফিক জ্যাম ও জ্বালানী সংকটের মতো সমস্যা ভোগ করছেন।
গতকাল (শুক্রবার) তেহরানে আনুষ্ঠানিকভাবে খামেনির শোক ও দাফন অনুষ্ঠান শুরু হয়। টানা সাত দিন ধরে ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল তেহরানে আগত বহুকটি দেশের নেতারা খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। আজ সকাল থেকেই ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লার বাইরে লাখ লাখ মানুষ সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
খামেনির জানাজায় অংশ নিতে তেহরানের মেট্রো স্টেশনগুলোর বাইরে মানুষের ঢল নেমেছে। গ্র্যান্ড মোসল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সে পৌঁছানোর জন্য ভোর থেকেই ভিড় রেলস্টেশন ও টার্মিনালে ঢুকে পড়ে; রেকর্ড করা ভয়াবহ ভিড় ভিডিওতে দেখা গেছে—কালো পোশাক পরিহিত শত শত শোকার্ত মানুষ বন্ধ স্টেশনের গেটের বাইরে অপেক্ষা করছেন এবং গেট খোলা মাত্র প্রতিটি ট্রেনে উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে।
নিরাপত্তার কারণে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা ও খামেনির ছেলে মোজতবা আলী খামেনি এই শোক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন না। দেশীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, সম্প্রতি মোজতবাকে হত্যার হুমকি পেয়েছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাকে অনুষ্ঠানে না পাঠানোর।
প্রসঙ্গত, আয়াতুল্লাহ খামেনিকে আগ originallyকার পরিকল্পনা অনুযায়ী গত মার্চে দাফন করার কথা ছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে চলতে থাকা প্রতিরক্ষা কার্যক্রম দীর্ঘায়িত হওয়ায় সেই সূচি পিছিয়ে গেছে। সূত্র মতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ৮৬ বছর বয়সি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন; একই দিন থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের আগ্রাসন শুরু হয়।
সংঘাতের চলার ৪০ দিনের মাথায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় এবং গত ১৭ জুন দুটি দেশ একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে। বর্তমানে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় স্থায়ী শান্তিচুক্তির জন্য আলোচনা চলমান রয়েছে।
শোক উপলক্ষে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদল তেহরানে উপস্থিত আছেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল শোক জানিয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমান, জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখেইল কাভেলাশভিলি, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান, তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইয়িলমাজ ও রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভসহ কয়েকজন উল্লেখযোগ্য অতিথি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। তেহরানে অবস্থানরত অন্যান্য উচ্চ পর্যায়ের অতিথিদের মধ্যে ভারতের বিহারের গভর্নর সৈয়দ আতা হাসনাইন, কেন্দ্রীয় উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গারিটা, চীনের জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির সহসভাপতি হে ওয়েই এবং তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি প্রভৃতি নাম রয়েছে। এছাড়া ফিলিস্তিনের হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
সরকারি জানানো হয়েছে, পশ্চিমা কোনো কর্মকর্তাকে এ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। সংবাদসূত্র: সিএনএন, আলজাজিরা