জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তাদের ওঠানো যে সব আপত্তি ছিল সেগুলোকে সঠিকভাবে বিবেচনা করা হয়নি। পরে কিছু সংযোজন করা হলেও তা কোনো স্বচ্ছ ও মানসম্মত প্রক্রিয়ায় করা হয়নি—এ থেকেই সমস্যা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিই যে কর্মকাণ্ডগুলো দেখা যাচ্ছে, সেগুলোকে সামনে রেখে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন: সংসদের প্রক্রিয়া কোথা থেকে পরিচালিত হচ্ছে?
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সন্ধ্যায় ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ পাসের পর সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে সাংবাদিকদের এসব মন্তব্য করেন ডা. শফিকুর রহমান। চলতি সংসদে এ ছিল বিরোধী দলের চতুর্থবারের মতো ওয়াকআউট।
তিনি বলেন, বিল পাসের অন্তত এক দিন আগে কাগজগুলো আমাদের দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু অধিবেশনে আমরা বসার পরই একে একে বিলগুলো আসে এবং রিপোর্টগুলো বিভিন্ন অংশে ভাগ করে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি তারা কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে তোলেন এবং জানান, ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। এসব অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য যে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাদের কাজ হচ্ছে সুপারিশসহ সংসদে উপস্থাপন করা—বাদ বা সংযোজন করার এখতিয়ার তাদের নেই, কারণ এটি সংসদের সম্পত্তি।
তিনি আরও বলেন, বাস্তবে দেখা গেছে এমন কথাও শোনা গেছে যে মন্ত্রী ছাড়া এই প্রক্রিয়া কার্যকর হবে না। এমনকি তাদের বোঝানো হয়েছে, আজ তারা বিরোধী দলেই থাকলেও ভবিষ্যতে সরকারি দলে গেলেই এ সুবিধা নেবেন। এ ধরনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ডা. শফিক জানান, তারা এখানে কোনো সুবিধা নিতে আসে নি; তারা এসেছে জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য।
স্বাভাবিক নিয়মে এক দিন আগেই ডকুমেন্ট সরবরাহ করা হয়নি, বলে অভিযোগ করেন তিনি। অধিবেশনে বসে আতঙ্কভাজনভাবে একের পরে এক প্রস্তাব সামনে আনা হলে, যা তারা দেখেনি বা বিবেচনা করার সময় পায়নি—এসবের ওপর কিভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে?—তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে বলেন।
বিশেষ কমিটির ব্যাপারেও তাদের আস্থা ভঙ্গ হয়েছে বলেও জানান জামায়াত আমির। শুরুতে সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে গঠিত ওই কমিটিতে তারা আস্থাশীল ছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই আস্থা ভেঙে যায়। কিছু লোক দাবি করেছেন মন্ত্রী ছাড়া অন্যরা ‘বেসরকারি’ সদস্য; তাহলে সংস্কৃতি মন্ত্রী কেন এটি গ্রহণ করলেন—গ্রহণের পর তো আর তা বেসরকারি থাকবে না। বিষয়টি তোলার পর সংস্কৃতি মন্ত্রী বলেছেন তিনি নিজে নাকি জানতেন না। একজন মন্ত্রী এমন কথা বললে আত্মপ্রশ্ন জাগে: এই প্রক্রিয়া কোথা থেকে পরিচালিত হচ্ছে?
স্পিকারের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়ার পর তাঁদের বলা হয় ‘আপাতত এভাবে পাস করে নেওয়া যাক, ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আপনাদের বিল আনার সুযোগ থাকবে’। কিন্তু যারা নিজেরাই নিজেদের বিল ও প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রাখতে পারে না, তাদের ভবিষ্যৎ আশ্বাস বিরোধী দল গ্রহণ করবে না—এই বক্তব্যও তিনি দেন।
অধ্যাদেশ সংক্রান্ত প্রসঙ্গ তুলে ডা. শফিক বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপিত হয়েছে এবং নিয়ম অনুযায়ী ৩০ ক্যালেন্ডার দিনের মধ্যে এগুলোর নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। সেই দিন সংসদে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন সরকারি দলের সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের সদস্যরা সেখানে ছিলেন। একাধিক বৈঠকের পর হঠাৎ করেই একটি রিপোর্ট তৈরি হয়।
বিরোধী দলের সদস্যরা ওই রিপোর্ট যৌথভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্ন করলে তারা জানান, এ ধরনের কোনো চূড়ান্ত বৈঠক হয়নি। তখনই তাদের সন্দেহ আরও জোরালো হয়।
সব মিলিয়ে ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সংসদের স্বত্ব রক্ষার দাবি নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলছে এবং এসব বোধগম্য ব্যাখ্যা না পেলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর অবস্থান নেবেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।