খুলনা নগরীর ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তুলে ধরে কেসিসি আয়োজিত এক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় নগর ভবনের জিআইজেড মিলনায়তনে সভার সভাপতিত্ব করেন কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। কাজে মিলিয়ে নেওয়া ‘ডিমান্ড ফর জাস্টিস’ শীর্ষক নোটিশের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) কর্তৃক প্রস্তাবিত বিষয়ে কেসিসি এ কর্মশালার আয়োজন করে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান প্রফেসর ড. মোঃ মুজিবুর রহমান, পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিগণ, পরিবেশবাদী সংগঠন বেলা ও অন্যান্য বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা। গবেষণায় দেখা গেছে, খুলনায় প্রতি ৫০০ টন নগর বর্জ্যের মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ প্লাস্টিক (প্রায় ৭৫ টন) এবং ১০ শতাংশ ই-বর্জ্য (প্রায় ৫০ টন) রয়েছে। এ অনুপাতে ই-বর্জ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় ২০–৩০ শতাংশ করে বাড়ছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সভায় বলা হয়, নির্দিষ্টভাবে আলাদা করে ই-বর্জ্য সংগ্রহ করা না হলে মাটি, পানি ও বাতাস দূষণের পাশাপাশি কৃষি জমির উৎপাদন হ্রাস, শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যা এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হবে। এই কারণেই স্থানীয়ভাবে সুসংগঠিত ব্যবস্থাপনা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তৎপরতা জরুরি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নগরবাসীর মাঝে ই-বর্জ্যের ক্ষতিকর দিকগুলো বোঝাতে প্রচারপত্র বিতরণ, বিলবোর্ড ও পোস্টারের মাধ্যমে প্রচার, কেসিসি ছাড়াও সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থাকে সচেতনতা কাজে যুক্ত করার অনুরোধ এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে।
সভায় আরও সুপারিশ করা হয়—ইলেকট্রনিক পণ্যের অতিরিক্ত ব্যবহার কমানো, প্রতিটি পণ্য দীর্ঘ সময় ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সম্ভব হলে নির্মাণাধীন বর্জ্য রিসাইক্লিং প্ল্যান্টে ই-বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের সুব্যবস্থা রাখার জন্য পরিকল্পনা নেওয়া।
সভায় বক্তৃতায় কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, মহানগরকে ঝুঁকিমুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত করে তোলা আমাদের মৌলিক দায়িত্ব। গ্রীন, ক্লীন ও হেলদি সিটি গড়ার প্রথম ধাপ হচ্ছে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ। বর্জ্য সংগ্রহকারী থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সব অংশীদারকে পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে এনে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে।
সভায় কেসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব আহমেদ, প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান খান, চীফ প্লানিং অফিসার আবির উল জব্বার, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ শরীফ শাম্মিউল ইসলাম, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রহিমা সুলতানা বুশরা, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কোহিনুর জাহান, নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আনিচুজ্জামান, শেখ মোঃ মাসুদ করিম, কঞ্জারভেন্সী অফিসার প্রকৌশলী মোঃ আনিসুর রহমান, প্রকৌশলী মোঃ অহিদুজ্জামান খান, আর্কিটেক্ট রেজবিনা খানম, ভেটেরিনারি সার্জন ড. পেরু গোপাল বিশ্বাস, আইটি ম্যানেজার শেখ হাসান হাসিবুল হক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোল্লা মারুফ রশীদ, এস্টেট অফিসার গাজী সালাউদ্দিনসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
বিকেলে কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু নগর ভবনের শহিদ আলতাফ মিলনায়তনে কেসিসি’র পুঙ্খানুপুঙ্খ পূর্ত বিভাগীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে এক সভায় মিলিত হন। সেখানে তিনি নগরীতে চলমান বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি দেখে নির্দেশনা দেন। জলাবদ্ধতা নিরসনকে সর্বোচ্চ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে বিদ্যমান ড্রেন, নদী পাঠরোধ ও অবকাঠামো ব্যবহার করে সমস্যার সমাধান করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি নগর সম্প্রসারণ, ময়ূর নদী সংস্কার, রিভারসাইড সড়ক নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত শহর রক্ষা বাঁধগুলো মেরামতের জন্য পরিপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
অবশেষে সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে: ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, সচেতনতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, একটি কর্মদল গঠন করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ এবং সম্ভাব্য রিসাইক্লিং সুবিধা দ্রুত চালু করা। এ উদ্যোগই হবে খুলনাকে একটি স্বাস্থ্যকর ও টেকসই নগর ঘোষণা করার পথে প্রথম ধাপ।