বাগেরহাটের খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার সংলগ্ন দিঘি থেকে তুলে নেওয়া কুমিরটিকে আবার দিঘিতে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানালেন মাজারের খাদেমরা। রোববার দুপুর বাগেরহাট প্রেসক্লাব মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম এই দাবি জানান।
প্রধান খাদেম জানান, মাজার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা অনুমতি ছাড়া দিঘি থেকে কুমিরটিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এটি বাগেরহাটের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রতারণা এবং মাজারের সংস্কৃতিগত স্বত্বের লঙ্ঘন—এজন্য কুমিরটিকে যেকোনো মূল্যে দিঘিতে ফিরিয়ে দিতে হবে। তিনি আরও চাইলে আইনগত পথে যাবেন বলেও জানান।
সংবাদ সম্মেলনে মাজারের অন্য খাদেম ফকির পেয়ার আলী, সৈয়দ খালিদ আহম্মেদ, শেখ রবিউল ইসলাম, শেখ আব্দুল জলিল, কাজী শাকিল, শেখ শামিম হাসানসহ মাজার পরিচালনা কমিটির সদস্য ও স্থানীয় অর্ধশতাধিক বাসিন্দা উপস্থিত ছিলেন।
খাদেমরা জানান, পূর্বে চিকিৎসার জন্য দিঘি থেকে দুইটি কুমির নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কিন্তু সেগুলো ফিরে আসেনি—এই অভিজ্ঞতাও তাদের উদ্বিগ্ন করেছে। তাদের ব্যাখ্যা, প্রায় সাড়ে ছয়শো বছর আগেই উলুঘ খান জাহান আলী দিঘি খননের সময় পানির নিরাপত্তা ও সংরক্ষণের কারণে সেখানে কুমির অবমুক্ত করেছিলেন এবং তখন থেকেই মাজারের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে কুমিরের উপস্থিতি ছিল।
তবে দীর্ঘ সময় ধরে প্রজনন না হওয়া, নানা দুর্ঘটনা ও মানবসৃষ্ট কারণে একে একে কুমিরগুলো মারা যেতে থাকে। স্থানীয় বংশধারার কুমিরের মৃত্যুর সর্বশেষ ঘটনা ছিল ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি। পরে ২০০৫ সালে ভারত থেকে কয়েকটি কুমির নিয়ে এসে দিঘিতে অবমুক্ত করা হয়েছিল, কিন্তু সেগুলোরও কয়েকটি পরে মারা যায়। দুই কুমিরের মধ্যে একটি ২০২৩ সালের অক্টোবরেই মারা গেলে সাম্প্রতিক কালে দিঘিতে মাত্র একটিই কুমির অবশিষ্ট ছিল।
খাদেমরা বলেন, ওই কুমিরটি সম্প্রতি মানুষ ও পোষ্য প্রাণীর ওপর আক্রমণ চালায়; চলতি বছরের এপ্রিলেও এক কুকুরের প্রাণহানি ঘটেছিল। সবচেয়ে ব্যথার ঘটনার মধ্যে রয়েছে গত ১ জুন রাত সাড়ে আটটার দিকে মাজারসংলগ্ন দিঘির পূর্ব পাশের নারী ঘাটে গোসল করতে নামার সময় সাত বছর বয়সী ফাতেমা আক্তারকে কুমিরটি পানির নিচে টেনে নেওয়ার ঘটনা; ২ জুন ভোরে শিশুটির মরদেহ দিঘি থেকে উদ্ধার করা হয়।
ফাতেমা আক্তারের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা বিবেচনায় জেলা প্রশাসন ৩ জুন কুমিরটিকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে স্থানান্তর করে। জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্তে খাদেমরা হলেও আপত্তি জানিয়েছে—তারা চান কুমিরটি স্থানান্তর না করে দিঘিতেই সংরক্ষণ করা হোক।
খাদেমরা পুনরায় দাবি তুলেছেন, কুমিরটির ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব মাথায় রেখে প্রশাসন ও মাজার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দিঘিতে কুমিরটি ফেরত আনতে হবে এবং যদি প্রয়োজন হয় তারা আদালতের দ্বারও کھুলে রাখতে প্রস্তুত।
স্থানীয়রা বলছেন, মাজারের দিঘিতে কুমিরের উপস্থিতি দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ; নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ঐতিহ্য রক্ষা করাই তাদের মূল দাবি। খাদেমরা আশা ব্যক্ত করেন, সংবেদনশীলতা ও ঐতিহ্যের সম্মান রক্ষা করে দ্রুত সমাধান হবে।