ঈদুল আজহা সামনে, কিন্তু এইবার পশ্চিমবঙ্গে সরকারি ছুটি কমিয়ে একদিন করা হয়েছে। বছরের শুরুতে রাজ্যের আগে থেকেই প্রচলিত মেয়াদ ভুলে গিয়ে — যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনামলে গত প্রায় ১৫ বছর ধরে ঈদ উপলক্ষে দুই দিন সরকারি ছুটি দেওয়া হতো — এবার বদল হয়েছে। মমতা আগে ২৬ ও ২৭ মে দুদিন ছুটির ঘোষণা করলেও, নবন্বিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার সেই ছুটি বদলে দিয়েছে।
শনিবার নবান্ন থেকে জারি করা বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ২৬ বা ২৭ মে নয়; ঈদ উপলক্ষে শুধুমাত্র ২৮ মে বৃহস্পতিবার একদিন সরকারি ছুটি থাকবে। প্রশাসন ও নবান্ন সূত্রে জানানো হয়েছে, মূলত চাঁদ দেখা ও ঈদের সময় নির্ধারণের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করতে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করেই সাধারণত ঈদের দিন নির্ধারিত হওয়ায় ক্যালেন্ডারের আগের তারিখ বদলে ২৮ মে বৃহস্পতিবারকে ছুটির দিন হিসেবে নেওয়া হয়েছে—এমনটাই বলা হচ্ছে।
তবে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ছুটি ভিন্ন দিনে করাকে কেবল ধর্মীয় পবিত্রতার কারণে প্রয়োজনীয় হিসাবেই দেখা হচ্ছে না; তাদের ধারণা, এর আড়ালে থাকতে পারে নতুন সরকারের রাজনৈতিক ইঙ্গিত। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই শুভেন্দু অধিকারীর সরকার কয়েকটি সিদ্ধান্ত এনেছে, যেগুলো মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
এর আগে ১৩ মে রাজ্য সরকার ‘পশু জবাই সংক্রান্ত নির্দেশিকা’ জারি করে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সরকারের অনুমতি ছাড়া কেউ গরু বা মহিষ জবাই করতে পারবেন না এবং জবাইয়ের জন্য গরুর বয়স কমপক্ষে ১৪ বছর হওয়া প্রয়োজন — এমন শর্ত রাখা হয়েছে। ওই ঘোষণা কেন্দ্র করে কোরবানির আগে রাজ্যে গরু কেনাবেচা প্রায় বন্ধের পথে পৌঁছায়।
ফলে মিলেছে চরম আর্থিক আঘাত। মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং মালদহের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলায় প্রতি বছরে কোরবানির মৌসুমে গরু-বাণিজ্য থেকে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। এবার নতুন নিয়ম, আইনগত জটিলতা ও পুলিশের সম্ভাব্য হয়রানির আশংকায় মুসলিম ক্রেতারা সরাসরি হাটে এসে গরু কেনাচ্ছে না; অনেকেই বাধ্য হয়ে ছাগল বা ভেড়ার দিকে ঝুঁকছেন। ফলত গরু ব্যবসায়ী ও খামারিরা বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
খামারি ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তারা বছরের পর বছর গরু পালন করে কোরবানির সময় বিক্রির ওপর নির্ভরশীল। এবার বিক্রি না হলে ঋণ পরিশোধসহ জীবিকা চালানো কঠিন হবে। কেউ কেউ ক্ষতিপূরণ বা বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি জানিয়েছেন। সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন, দেশে গবাদী পশুর রফতানিতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়লেও অভ্যন্তরীণ বাজারে ক্ষুদ্র খামারি ও ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর কেন কড়াকড়ি বাড়ানো হচ্ছে — এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষক ও খুচরা ব্যবসায়ীদের।
রাজ্যের চলমান সিদ্ধান্ত ও তাদের প্রভাব নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আরও ব্যাখ্যা পাওয়া না গেলে কোরবানির আগে বাজারের অনিশ্চয়তা ও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ কাটবে না বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন।
সূত্র: আনন্দবাজার, দ্য ওয়াল