বিক্রি ও বিতরণ কোম্পানিগেদের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের প্রতিবাদ জানিয়ে ভোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খুচরা ভোক্তা মূল্য বাড়ানোর আগে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’, সিস্টেম লস ও চুরি-দুর্নীতি মতো অন্তর্নিহিত কারণগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। সেই দাবি মেনে বিডিং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ক্যাপাসিটি চার্জ এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তি‑অডিট পুনর্বিবেচনার সম্ভাব্যতার ওপর সিরিয়াসলি নজর দেবে বলে জানিয়েছে।
দ্বিতীয় দিনের গণশুনানিতে ভোক্তা প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা বলেন, পাইকারি মুল্য বাড়ালেও খুচরা ভোক্তা বারবার বোঝা বহন করতেই হচ্ছে—তাই বিতরণ কোম্পানিগুলোর ‘আবদার’ প্রত্যাখ্যান করে বিকল্প ধরন খুঁজতে হবে। তারা নতুন এক শুনানির আয়োজন করে দরখাস্ত খারিজ করে ভোক্তা সংরক্ষণের উপায় খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছেন। ভোক্তা প্রতিনিধিরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে চুরি, উচ্চ সিস্টেম লস এবং পিপিএ চুক্তিতে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ নামে বছরে চোখে দেখা যায় এমন কোটি কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে—এই সব বিষয় ফাইন্যান্সিয়াল অডিট দিয়ে যাচাই করার দাবি তুলেছেন।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ শুনানিতে বলেন, “ক্যাপাসিটি চার্জ ও দায়মুক্তি আইনের অধীনে করা বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তিতে থাকা অতিরিক্ত শর্তগুলো পুনরায় দেখা দরকার। আমরা বিষয়টিকে সিরিয়াসলি নিচ্ছি। কোম্পানিগুলোর ফাইন্যান্সিয়াল অডিট ও ক্রয়চুক্তি পর্যালোচনা জরুরি।” তিনি আরও বলেছেন, ভবিষ্যতে কোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে বিইআরসির পূর্বানুমতি খাওয়া হবে এবং কমিশন ক্যাপাসিটি চার্জসহ সব তথ্য গভীরভাবে যাচাই করবে।
শুনানিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, “প্রতিবছর ৪২ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। সরকার ভর্তুকি দিয়ে সেই অর্থ তুলে নিচ্ছে—তাই প্রথমে প্রশ্ন করা দরকার, এই চার্জগুলো কি সত্যিই প্রয়োজনীয়? পাকিস্তানের মতো দেশে নতুন চুক্তি করতে আগে ফাইন্যান্সিয়াল অডিটের ঘোষণা দিলে কোম্পানিগুলো রাজি হয়েছে। বাংলাদেশেও এমন দ্বায়িত্বশীল ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।” তিনি কেউ করে বলেন, দাম কমানোর জন্য একটি মডেল রেখে গণশুনানির আয়োজন করা উচিত।
সিনিয়র সাংবাদিক শুভ কিবরিয়া বলেন, “সরকার জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে, সেই সময়ে সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে খরচ চাপানো ঠিক না। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ শুনানিতে আসে না—এগুলোও আলোচনার যোগ্য।” তিনি বলছেন, বিদ্যুৎ খাতকে লাভের হাতিয়ার না করে কস্ট‑প্লাস মডেলে আনার প্রয়োজন রয়েছে এবং দায়মুক্তি আইনটিকেও পুনর্বিবেচনা করা দরকার।
সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “এই গণশুনানি যেন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পকেট কাটা হবে এমন কৌশল।” তিনি সন্তোষজনক বিশ্লেষণের দাবি তুলেছেন—যেমন ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিনামূল্যের বিদ্যুত দিলে কি পরিমাণ ভর্তুকি দরকার হবে এবং তা দিতে কতটা প্রভাব দেখা যাবে। তাঁর ভাষ্য, বিদ্যুতকে বাণিজ্যিক নয়, জনসেবামূলক খাত হিসেবে দেখতে হবে এবং বিইআরসিকে জনস্বার্থের সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলা দরকার।
একই সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জেবুন্নেসা বলছেন, বিতরণ কোম্পানিগুলোর সৃষ্টি হওয়া সিস্টেম লস বন্ধ করা বিইআরসির কাজ নয়—অবৈধ সংযোগ ও দুর্নীতি প্রতিরোধ করার দায় সরাসরি সংশ্লিষ্ট বিতরণ কোম্পানির উপর। ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, ভর্তুকি নির্ভর খাতে নানা শুল্ক ও কর থাকায় খরচ বেড়ে যায়—শুল্ক কমালেও খরচ অনেকটা কমানো সম্ভব।
তথ্য ও প্রস্তাব
গণশুনানিতে বিতরণকারী ছয়টি সংস্থা—বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), ঢাকা উত্তর বিদ্যুৎ সরবরাহ কোম্পানি (ডেসকো), ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ও নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো)—নানাভাবে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। দেশের মোট গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ কোটি, যার প্রায় ৪ কোটি আবাসিক। বিতরণ লাইনে গড় সিস্টেম লস ৭.৩৮% হলেও কিছু সংস্থায় তা প্রায় ১০% পর্যন্ত পৌঁছায়।
পিডিবি বলেছে, ২০২৬‑২৭ অর্থবছরে বিদ্যমান ট্যারিফ বজায় রাখলে তাদের প্রতি ইউনিটে ঘাটতি হবে ২৯ পয়সা। এ কারণ দেখিয়ে তারা খুচরা পর্যায়ের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব তুলেছে এবং নিম্নচাপ (এলটি) গ্রাহকসীমা ৮০ কিলোওয়াট থেকে কমিয়ে ৫০ কিলোওয়াট করার প্রস্তাব করেছে—যাতে ৫০ কিলোওয়াটের বেশি লোড ব্যবহারকারীদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে মধ্যচাপ (এমটি) ভূক্ত করা হবে। পিডিবি দাবি করেছে, ৫০ কিলোওয়াটের বেশি লোড গ্রাহক দ্রুত বাড়ছে এবং একই ট্রান্সফরমারে অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। এছাড়া বেসরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিক ট্যারিফে আনার দাবি তুলেছে তারা।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন ৮০টি সমিতি গড়ে ৫.৯৩% মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে এবং বলেছে, গড় বিক্রয়মূল্য বর্তমানে প্রতি ইউনিটে ৮ টাকা ৫০ পয়সা হলেও লোকসান এড়াতে প্রতি ইউনিটে ন্যূনতম ৯ টাকা প্রয়োজন। তারা লাইফলাইন সুবিধা আরও সংকুচিত করার সুপারিশ করেছে—শুধু অনুমোদিত লোড ১ কিলোওয়াট বা কম এবং মাসিক ব্যবহার সর্বোচ্চ ৫০ ইউনিটের মধ্যে থাকা গ্রাহকরা লাইফলাইন সুবিধা পাবেন। পাশাপাশি কিছু শিল্প ও চার্জিং স্টেশনকে আলাদা শ্রেণিতে নেওয়ার প্রস্তাব এসেছে।
ডিপিডিসি গড়ে ৬.৯৬% মূল্যবৃদ্ধির আবেদন করেছে এবং প্রিপেইড গ্রাহকদের কাছ থেকে নতুন সিকিউরিটি চার্জ নেওয়া, কম পাওয়ার ফ্যাক্টর গ্রাহকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ও নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ট্যারিফ দ্বিগুণ করার মত কঠোর প্রস্তাব দিয়েছে। ডেসকো জানিয়েছে, ২০২২‑২৩ থেকে ২০২৪‑২৫ পর্যন্ত তাদের মোট ঘাটতি ২ হাজার ৬১১ কোটি টাকা; সেই ক্ষতিপূরণ হিসেবে তারা গড়ে ৯.৬৭% বৃদ্ধির দাবি তুলেছে। ওজোপাডিকো বর্তমানে প্রতি ইউনিটে ৮৫ পয়সা ঘাটতির কথা বলেছে এবং গড়ে ৮–১২.২৫% পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব তুলেছে। নেসকো জানিয়েছে, তাদের বিতরণ ব্যয় দ্রুত বেড়ে ২০২৬‑২৭ সালে প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৬৬ পয়সা পৌঁছাতে পারে এবং বর্তমানে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৩৮ পয়সা লোকসান হচ্ছে।
কারিগরি কমিটির সতর্কতা
বিতরণ সংস্থাগুলোর ঢালাও প্রস্তাবের বিপরীতে কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি (জিইসি) বেশ কিছু আপত্তি জানিয়েছে। কমিটি বলেছে, এলটি লোড সীমা একেবারে হঠাৎ করে ৮০ থেকে ৫০ কিলোওয়াটে নামানো উচিত নয়—এর আগে স্বাধীন গবেষণা করা দরকার এবং ‘রেগুলেটরি ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ করতে হবে। একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঢালাওভাবে বাণিজ্যিক শ্রেণিতে আনা সামাজিক ও নীতিগতভাবে সঠিক না বলে কমিটি মত দিয়েছে। নন‑ডিমান্ড মিটারের ক্ষেত্রে অনুমানের ভিত্তিতে অতিরিক্ত লোড নির্ধারণ না করে পর্যায়ক্রমে ডিমান্ড মিটার স্থাপনের সুপারিশ করেছে জিইসি।
পরবর্তী প্রক্রিয়া
বিইআরসি বলেছেন, তারা কোম্পানিগুলোর ফাইন্যান্সিয়াল অডিট ও পিপিএর ধারাগুলো ঘনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা করবে এবং প্রয়োজন হলে নতুন শর্তে চুক্তি বা ভর্তুকির পুনর্বিন্যাসের শর্ত জারির কথা ভাববে। ভোক্তা প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা চেয়েছেন, দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে খরচ‑কঠিয়ার পরিবর্তে সিস্টেম দক্ষতা, চুরি ও দুর্নীতি রোধ, কর ও শুল্ক হ্রাস ও লাইফলাইন সুরক্ষা নিয়ে বিকল্প মডেল নিয়ে গণশুনানির আয়োজন করা হোক।
সূত্র: আজকের পত্রিকা (অনলাইন) ।