বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, ইবোলার প্রতিরোধী টিকা পুরোপুরি তৈরি করে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ হতে আনুমানিক ৯ মাস সময় লাগতে পারে। সংস্থার উপদেষ্টা ড. ভাসি মূর্তি বুধবার জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন।
ড. ভাসি জানান, বুন্ডিবুগিও প্রজাতির ইবোলা ভাইরাসের বিস্তার রোধে দুই ধরনের সম্ভাব্য ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিন তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। তবে এগুলো এখনও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই টিকা বাজারে আসা ও ট্রায়াল সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
বর্তমান প্রাদুর্ভাব কেন্দ্রীভূত রয়েছে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক কঙ্গোতে। ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, কঙ্গোতে ইবোলার উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত ১৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও প্রায় ৬০০ জনের মধ্যে উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। ড. ভাসি আরও জানান, যাদের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিয়েছে তাদের মধ্যে ৫১ জনকে পরীক্ষা করে ইবোলায় আক্রান্ত হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে; পাশাপাশি প্রতিবেশী উগান্ডায় ২ জন ইবোলায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। কঙ্গোর ৫১ জন রোগী 모두 দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি ও উত্তর কিভু প্রদেশের বাসিন্দা, আর উগান্ডার দুইজন কামপালার বাসিন্দা।
ডব্লিউএইচও ১৭ মে কঙ্গোর যে প্রাদুর্ভাব এসেছে সেটিকে জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করলেও সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস বলছেন, এটি এখনও বৈশ্বিক মহামারির পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তিনি বলেন, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে পরিস্থিতি উচ্চমাত্রার হলেও বৈশ্বিক দিক থেকে তা এখনও মহামারি হিসেবে বিবেচিত হয়নি।
প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় যুক্তরাজ্য ২ কোটি পাউন্ড (প্রায় ৩২৯ কোটি ৪১ লাখ টাকায় সমান) অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই তহবিল স্বাস্থ্যকর্মীদের ভাতা, প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বাড়াতে ব্যবহার করা হবে।
ইবোলা ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নাম—অর্থোইবোলাভাইরাস জাইরেন্স। এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের ছয়টি প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে: জাইর, সুদান, বুন্ডিবুগিও, রেস্টন, তাই ফরেস্ট ও বোম্বালি। ২০১৪ সালে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ঘটিয়েছিল জাইর প্রজাতি; কিন্তু এই মুহূর্তে কঙ্গো ও উগান্ডার প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ভ্যারিয়েন্টটি বুন্ডিবুগিও বলে জানা গেছে।
প্রধানভাবে মানুষ ও প্রাইমেটগুলোকে লক্ষ্য করে ইবোলা আক্রন্ত করে। ফলখেকো বাদুড়কে ভাইরাসটির প্রাকৃতিক বাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়—উপরন্তু বনমানুষ, হরিণ ও সজারু জাতীয় কিছু প্রাণীও ভাইরাস বহন করে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে। ইবোলা সাধারণত বায়ু মাধ্যমে ছড়ায় না; আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, লালা, ঘাম, বমি, মল-মূত্র বা অন্যান্য শারীরিক তরলের সরাসরি সংস্পর্শে এ রোগ সংক্রমিত হয়। সংক্রমিত ব্যক্তির ব্যবহৃত সুঁই, কাপড় বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় মৃতদেহের সংস্পর্শ থেকেও সংক্রমণ হতে পারে।
ইবোলার সাধারণ উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে হঠাৎ তীব্র জ্বর, প্রচণ্ড দুর্বলতা, মাথা ও গলা ব্যথা, পেশি ব্যথা, ডায়রিয়া ও বমি। রোগের অগ্রগতিতে লিভার ও কিডনির কাজ কমে যেতে পারে এবং শেষ পর্যায়ে নাক-মুখ বা মলদ্বার থেকে তীব্র রক্তক্ষরণ দেখা দিতে পারে। সাধারণত সংক্রমণের দ্বিতীয় দিন থেকেই লক্ষণাগুলি প্রকাশ পেতে শুরু করে।
ইবোলা অন্য ভাইরাসের তুলনায় বাতাসে ছড়ায় না বলে সংক্রামকতা কিছুটা কম হলেও রোগের মৃতুুহার হার অত্যন্ত বেশি। গড় মৃত্যু হার প্রায় ৫০ শতাংশ; ডব্লিউএইচও জানিয়েছে সাম্প্রতিক কঙ্গোর প্রাদুর্ভাবে মৃত্যুহার প্রায় ৪০ থেকে ৭০ শতাংশের মধ্যে পর্যবেক্ষিত হয়েছে। বর্তমানে কঙ্গোতে প্রায় ২৪৬ জন ইবোলায় আক্রান্ত বা উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৬ জন মার্কিন নাগরিক। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ৬ জনের মধ্যে ৩ জনের অবস্থা গুরুতর এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
প্রসঙ্গত, এসব তথ্যের সূত্র হিসেবে বিবিসি ও ডব্লিউএইচও-র বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে।