এক মাস তিন দিন হলো মোংলা চিলা উপজেলার জয়মনির ঘোল এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে রয়েছে মা তাছলিমা বেগমের বুকফাটা কান্নায়। ১০ এপ্রিল, সকাল থেকেই নিখোঁজ তার একমাত্র ছেলে, মিরাজ শেখ (৩০), কে তুলে নিয়ে যায় অজ্ঞাত অপরিচিত কিছু ব্যক্তি। এরপর থেকে তিনি তার সন্তানকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন, কিন্তু এখনও কোনো সন্ধান মেলেনি। বারবার থানায় জিডি, প্রতিমন্ত্রী ও সরকারের অন্যান্য দফতরে আবেদন করেও কিছু ফল হয়নি। এই সন্তানের জন্য একটি অসহনীয় অপেক্ষা চলেছে, মা বলতে চান, তার ছেলে যেন জীবিত বা মৃত—কোনোটাই অবিচলভাবে জানতে চান। পরিবারের জন্য এই নিখোঁজের কান্না শুধু হৃদয় বিদারক নয়, বরং মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণেও পরিণত হয়েছে। তারা এখন কেবল একটাই প্রত্যাশা করছেন— যেন তাদের সন্তানকে দ্রুত ফিরে পায় এবং সত্যতা নিশ্চিত হয়। পরিবারের সদস্যরা জানাচ্ছেন, তার স্বামী সুন্দরবনের জেলে ও মাছধরা জেলায় মোটরসাইকেল চালক হিসেবে কাজ করতেন। গত ৬ এপ্রিল বন্ধু বাচ্চু ও রফিকুলের সঙ্গে মিলিত হয়ে সুন্দরবনে মাছ ধরতে যান। চার দিনের পরিশ্রমের পরে ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় তারা ফিরে আসেন। তখনই স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সন্ধ্যা ৭টার দিকে জয়মনির ঘোলের একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সময় মিরাজকে অজ্ঞাত পরিচিত কিছু ব্যক্তি জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে একজনের সন্দেহ হওয়ায় স্থানীয়রা আন্দাজে দেখেন, একটি নৌযানে করে দ্রুত তাকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়নি। মা তাছলিমা কেঁদে কেঁদে বলেন, ‘আমার পোলার জন্য আমার বুকের টুকরো যে এক মাস ধরে হারিয়ে গেছে, কেউ কেউ বলতে পারে না ও কই আছে। যদি ও কোনো অপরাধে জড়িত হয়, তবে দেশের আইন আছে, বিচার হবে। কিন্তু ওকে কেন লুকানো হচ্ছে? আমার মনে হচ্ছে, ওর ওগো কিছু করেছে, ও কি সাগরে ভাসিয়্যা ফেলছে?’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরও বলেন, ‘আমি চাই ও ফিরুক—আমি তার মুখটা একবার দেখবো। ও কি খাচ্ছে? ও কি মার খাচ্ছে? আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, ও যেন আমার কোল ফিরে আসে।’ Although তার পরিবার নিঃসন্দেহে উদ্বিগ্ন, একটু অন্যরকম ঘটনা ঘটে গেলো ২২ এপ্রিল, মিরাজের বন্ধু বাচ্চুকে মোংলা কোস্ট গার্ডের একটি দল তুলে নিয়ে যায়। রাতে তাকে থানায় সোপর্দ করা হলেও মিরাজের খোঁজে কোনো স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি। স্থানীয়রা সন্দেহ করছেন, হয়তো অভিযানের সময়ই তাকে তুলে নেওয়া হয়েছে। তবে এই ব্যাপারে সরকারি পক্ষ কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেনি। নিখোঁজের পর থেকে তার স্ত্রীর দায়িত্ব ভর করে, তিনি মোংলা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। এছাড়া, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদনও জানানো হয়েছে, কিন্তু তৎপরতা কম থাকায় পরিবারের আতঙ্ক আরও বাড়ছে। মিরাজ পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস ছিলেন, তাঁর হারিয়ে যাওয়ার পর সংসারে অস্থিরতা শুরু হয়। মা শোকে কাতর, স্ত্রী ভয় পাচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দারাও এই রহস্যজনক নিখোঁজের ঘটনার জন্য উদ্বিগ্ন। যখন সুন্দরবনে দস্যুমুক্ত অভিযানের খবর আসছে, তখনই এই অন্তর্ধান অন্য এক প্রশ্ন তুলে ধরছে— বিষয়টি কি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে? পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত তাকে উদ্ধার করে জনসম্মুখে আনা হোক। মোংলা সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ রেফাতুল ইসলাম বলেন, ‘মিরাজ শেখের নিখোঁজের ঘটনায় তার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় জিডি করা হয়েছে। আমরা তদন্তে আন্তরিক, তার সন্ধানে গোয়েন্দা ও অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছি। তাকে কোথায় কোথায় রাখা হয়েছে বা আটক করেছেন কি-না, সে বিষয়েও তথ্য সংগ্রহ করছি। পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে আশ্বাস দেন।’ প্রত্যাশা, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেন দ্রুত সমাধান হয় এবং নিখোঁজের পরিবারের মনোবাসনা পূরণ হয়। মা তাছলিমার চোখের জল যেন অবহেলা না হয়, এবং তার সন্তানকে ফিরিয়ে ফিরিয়ে আনা হয়—এটাই এখন বড় প্রত্যাশা।