গত এপ্রিলে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫১০ জন। এক মাসে মোট সংঘটিত হয়েছে ৫২৭টি সড়ক দুর্ঘটনা, যার ফলশ্রুতিতে আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৬৮ জন। এছাড়া রেলপথে ৫৪টি দুর্ঘটনায় নিহত ৪৯ জন এবং নৌপথে পাঁচ দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়, যেখানে চারজন মারা যান। সব মিলিয়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে মোট ৫৮৬টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৬৩ জন আর আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৭৯ জন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পাঠানো এক প্রতিবেদনে বৃহস্পতিবার (১৩ মে) এসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী সংবাদমাধ্যমে পাঠানো প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন। তারা জানিয়েছেন, গণমাধ্যমের দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল পর্যবেক্ষণ করে এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে। তবে এটাই সম্পূর্ণ ছবি নয়, কারণ দুর্ঘটনার অধিকাংশই সংবাদপত্রে প্রকাশ হয় না, ফলে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে মনে করেন সংগঠনটি।
এপ্রিলে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে, যেখানে ১৩৫টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৩৭ জন এবং আহত হয়েছেন ২৬৩ জন। অন্যদিকে, কম দুর্ঘটনার তালিকায় রয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগ, যেখানে ১৭টি দুর্ঘটনায় ১৮ জন মারা গেছেন এবং আহত হয়েছেন ৬৪ জন।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ৯৯ জন বিভিন্ন পরিবহনের চালক, ৮২ জন পথচারী, ৫৬ জন শিক্ষার্থী, ৫২ জন নারী, ৪৭ শিশু, ২৫ জন পরিবহন শ্রমিক, তিনজন চিকিৎসক, দুইজন বিজিবি সদস্য, পাশাপাশি একজন পুলিশ, একজন বিমানবাহিনী সদস্য এবং একজন সাংবাদিক। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ আটজনের প্রাণহানি ঘটেছে।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে—মোটের ৩৮.৫১ শতাংশ। এরপর রয়েছে আঞ্চলিক মহাসড়ক যেখানে ৩১.৪৯ শতাংশ, এবং ফিডার রোডে ২২.৯৬ শতাংশ দুর্ঘটনা। এছাড়া ঢাকা মহানগরীতে ৫.৬৯ শতাংশ, চট্টগ্রাম মহানগরীতে ০.৭৫ শতাংশ ও রেলক্রসিংয়ে ০.৫৬ শতাংশ দুর্ঘটনা রেকর্ড হয়েছে।
সংগঠনটি দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করে— মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অতিরিক্ত চলাচল; রোড সাইন বা মার্কিং এর অভাব; রেলক্রসিংয়ে হঠাৎ বাস উঠে আসা; মাঝখানে রোড ডিভাইডার না থাকা; গাছপালার আড়ালে দৃষ্টির প্রতিবন্ধকতা; সড়ক নির্মাণের ত্রুটি; নানাবিধ যানবাহনের ত্রুটি; যানবাহনের চালনাকানুনের লঙ্ঘন; উল্টোপথে যানবাহন চালানো; সড়কে চাঁদাবाजी; পণ্যবাহী যানবাহনের যাত্রী পরিবহন; অদক্ষ চালক ও ফিটনেসহীন যানবাহন; অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন; দ্রুত গতি ও দীর্ঘ সময় চালনা— এ সকল কারণ।
নিরাপদ সড়ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে সাজানো হয়েছে সাতচল্লিশ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ, যেমন— প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য স্মার্ট পদ্ধতি চালু করা; মোবাইলের মাধ্যমে ভাড়ার নিয়ম চালু; মহাসড়কগুলোতে রাতে আলোকসজ্জা; প্রশিক্ষিত চালকের সংখ্যা বাড়ানো; বিআরটিএ এর অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুল থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া বাধ্যতামূলক; সড়ক পরিবহন সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা; মহাসড়কে সার্ভিস লেন চালু করা; চাঁদাবাজি বন্ধ ও চালকদের বেতন-পরিশ্রমের নিশ্চয়তা প্রদান; ফুটপাত এবং পথচারীদের জন্য নিরাপদ পাড়াপড়ার ব্যবস্থা; রোড সাইন ও মার্কিং স্থাপনের উপর গুরুত্বারোপ; আধুনিক বাসের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা ও বিএআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি; মানসম্পন্ন সড়ক নির্মাণ ও নিয়মিত রোড সেফটি অডিট চালানো। এছাড়া, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে একটি বিশেষ দুর্ঘটনা গবেষণা ইউনিট প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে।
সর্বোপরি, প্রতিবেদনে পরিবহন সেক্টর বিষয়ে ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে, যাতে এসব দুর্ঘটনা প্রতিরোধ সম্ভব হয় এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।