২০২৪ সালে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এক কঠিন বছর পার করল—বহু ব্যাংক আর্থিক চাপের মুখে পড়ে এবং সিএসআর খাতে ব্যয়ও নাটকীয়ভাবে কমেছে। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রিপোর্ট করা ওই সময়ে ৬১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক সিএসআর খাতে মোট মাত্র ৩৪৫ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। আগের বছরের তুলনায় এটি প্রায় ২৭০ কোটি ৯১ লাখ টাকা বা প্রায় ৪২ শতাংশ কম।
অর্থাৎ বিগত এক দশকে সিএসআর খাতে এটিই সর্বনিম্ন ব্যয়। পূর্বে ২০১৫ সালে খাতে সবচেয়ে কম ব্যয় ছিল ৫২৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা—তার তুলনায় এ বার প্রায় ১৮২ কোটি টাকা (৩৪.৫৭ শতাংশ) কম ব্যয় হওয়া খাতটিতে নতুন নিম্নমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ধারাবাহিকভাবে সিএসআর ব্যয় কমছে: রিপোর্টে ২০২২ সালে ব্যয় ছিল ১,১২৯ কোটি টাকা, ২০২৩ সালে ৯২৪ কোটি ৩২ লাখ এবং পরবর্তী বছরে ৬১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় নামে আসে—দুই বছরের ব্যবধানে সিএসআর ব্যয় প্রায় ৫১৩ কোটি টাকা বা ৪৫ শতাংশের বেশি কমে গেছে।
ব্যাংক খাতের সূত্রগুলোর মতে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা—বিশেষ করে ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও সরকার পরিবর্তনের প্রভাব এবং কিছু ব্যাংকের অনিয়ম ও অর্থ পাচারের তথ্য প্রকাশ—ব্যাংকিং খাতে বড় আঘাত করেছিল। কাগজে-কলমে প্রদর্শিত মুনাফার বিপরীতে প্রকৃত আর্থিক অবস্থা সামনে আসতে থাকে, খেলাপি ঋণের কারণে প্রকৃত লোকসান প্রকাশ পায় এবং কিছু শরীয়াভিত্তিক ব্যাংক বিশেষভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর স্থিতিশীলতা ফেরাতে সরকার কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
ব্যাংকারদের দাবি, রাজনৈতিক চাপও সিএসআর ব্যয় কমানোর একটি বড় কারণ। পূর্বের রাজনৈতিক সময়ে বিভিন্ন স্তর থেকে অনুদান বা সহায়তার জন্য ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ থাকাতো; ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যয় প্রকৃত সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতার বাইরেও চলে যেত। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি ও পরবর্তী গঠনতন্ত্র পরিবর্তনের পরে সেই ধরনের চাপ অনেকটাই কমে গেছে, ফলে ব্যাংকগুলো এখন তুলনামূলকভাবে সংযতভাবে সিএসআর খরচ করছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সিএসআর খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জরুরি, কারণ রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে এই অর্থ অনুৎপাদনশীল কাজে খরচ হতে পারে এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দিকনির্দেশনায় ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফার একটি অংশ সিএসআর হিসেবে ব্যয় করার কথা বলা আছে—যার মধ্যে প্রস্তাবিত অনুপাত: ৩০ শতাংশ শিক্ষা, ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্য, ২০ শতাংশ পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং বাকি ২০ শতাংশ অন্যান্য ক্ষেত্রে। তবে প্রতিবেদনের অনুযায়ী, বাস্তবে নির্দেশনার সঙ্গে পুরোপুরি মানা হচ্ছে না: ওই রিপোর্টকালে ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি (৩৬ শতাংশ) ব্যয় করেছে ‘অন্যান্য’ খাতে; শিক্ষায় ব্যয় ছিল ২৮.৫৩ শতাংশ, পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে মাত্র ১০ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতেও উল্লেখযোগ্য অংশ আছে।
প্রতিবেদন অনুসারে রিপোর্টকালে ১১টি ব্যাংক সিএসআর খাতে কোনো তৎপরতা দেখায়নি। সেগুলো হলো—জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।
আরও উল্লেখযোগ্য, ২০২৪ সালে মোট ১৭টি ব্যাংক নিট মুনাফা অর্জন করতে পারেনি। লোকসানবহুল ব্যাঙ্কগুলোর তালিকায় রয়েছে: জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। এর মধ্যে ছয়টি লোকসানকারী ব্যাংক সত্ত্বেও সিএসআর খাতে অর্থ ব্যয় করেছে—এবং সেগুলো হলো এবি ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।
সংক্ষেপে, ব্যাংকিং খাতে সংকটের ছায়া ও রাজনৈতিক ও আর্থিক অনিশ্চয়তার প্রভাবেই সিএসআর ব্যয় নাটকীয়ভাবে কমেছে; বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গ্রাফ বদলানো গেলে সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোর উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে—তাই স্বচ্ছতা, নিয়মনীতি মেনে চলা ও কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।