রেফারিং নিয়ে বিতর্ক, অভিযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মধ্যেই শেষ হলো ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবল নিরীক্ষক ফিফার বিশেষ ‘ইন্টেগ্রিটি টাস্ক ফোর্স’ বলছে, পুরো টুর্নামেন্ট পর্যবেক্ষণ করে তারা ম্যাচ পাতানো বা জুয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো কারসাজির প্রমাণ পাননি।
টাস্ক ফোর্স জানিয়েছে, আয়োজিত ১০৪টি ম্যাচের প্রত্যেকটিই সরাসরি নজরে রাখা হয়েছিল। শুধু মাঠের ঘটনাবলি দেখাই হয়নি — আন্তর্জাতিক বেটিং বাজারেও একই সঙ্গে নজর রাখা হয়েছিল, যাতে কোনো অস্বাভাবিক প্যাটার্ন বা সন্দেহজনক বেটিং কার্যকলাপ ধরা পড়তে পারে।
সংগ্রহ করা তথ্য ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে টাস্ক ফোর্স বলেছে, কোনো ম্যাচে অসম্মানজনক বেটিং বা সম্ভাব্য ম্যাচ কারসাজির আভাস পাওয়া যায়নি। এই পর্যবেক্ষণ ছিল মূলত ম্যাচ কারসাজি শনাক্তকরণে зори করা, তাই তারা রেফারিং সিদ্ধান্তগুলো ‘সঠিক’ না ‘ভুল’ হিসেবে বিচার করার দায়িত্বে ছিল না।
এ বছরের বিশ্বকাপ ছিল ৪৮ দলের অংশগ্রহণে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংস্করণ। এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা টুর্নামেন্টের মূল পর্ব শেষ হয় গত ১৯ জুলাই, যেখানে ফাইনালে ফেরান তোরেসের অতিরিক্ত সময়ের গোলে স্পেন ১-০য়ে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো খেতাব জিতেছে।
কয়েকটি ম্যাচে, বিশেষ করে নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার খেলার সময় রেফারিং নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছিল। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়, কোচ ও একাংশ সমর্থক অভিযোগ করেছিলেন যে ফিফা বা রেফারি দলটিকে সুবিধা দিচ্ছে। এমন অভিযোগ আর অনলাইন আবেদনের মধ্য দিয়ে কিছু আর্জেন্টাইনা সমর্থক তো ফাইনালের পুনরায় আয়োজনের দাবি পর্যন্ত তুলেছিলেন।
তবে টাস্ক ফোর্সের অনুসন্ধান মূলত বেটিং সাইটে অস্বাভাবিক প্রবণতা, মাঠে সন্দেহজনক ঘটনা এবং ম্যাচের ফলকে প্রভাবিত করতে পারে এমন যেকোনও ইঙ্গিত শনাক্তকরণে কেন্দ্রিত ছিল। রেফারিং-সংক্রান্ত সব বিতর্কের চূড়ান্ত রায় হিসেবে টাস্ক ফোর্সের এই প্রতিবেদনকে দেখা যাবে না বলে তারা নিজেই জানিয়েছে।
ফিফা জানিয়েছে, সদস্য সংস্থাগুলো থেকে পাওয়া বেটিং পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট, মাঠ পর্যবেক্ষণ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এছাড়া খেলোয়াড়, কর্মকর্তারা এবং সাধারণ মানুষের দেওয়া অভিযোগও এই প্রক্রিয়ার অংশ ছিল।
সংগৃহীত তথ্য নির্ধারিত পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করে টাস্ক ফোর্সের মধ্যে ভাগ করা হত; কোনো সতর্ক সংকেত দেখলে দ্রুত যাচাই-বাছাই করে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
ফিফার জ্যেষ্ঠ ইন্টেগ্রিটি ব্যবস্থাপক লিয়াম রিচ বলেছেন, গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান, ঝুঁকি যাচাই এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার জন্য কার্যকর কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল এবং টাস্ক ফোর্সের সবাই সেই কাঠামো অনুযায়ী কাজ করেছে। তিনি টুর্নামেন্ট জুড়ে কাজ করা সদস্যদের দক্ষতা ও সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেও।
এই টাস্ক ফোর্সে এএফসি, সিএএফ, কনকাকাফ, কনমেবল, উয়েফা ও ওএফসি— ছয়টি মহাদেশীয় ফুটবল সংস্থা—সহ আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ফুটবল ফেডারেশন, পাশাপাশি এফবিআই, ইন্টারপোল, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এবং জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক দপ্তরও অংশ নেয়।
তার পাশাপাশি স্পোরট্রাডার, ইন্টারন্যাশনাল বেটিং ইন্টেগ্রিটি অ্যাসোসিয়েশন, জিনিয়াস স্পোর্টসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বেটিং পর্যবেক্ষণ ও ক্রীড়া স্বচ্ছতা সংগঠনও টাস্ক ফোর্সের কাজকে সহযোগিতা করেছে।
ফিফা বলছে তারা ভবিষ্যত প্রতিযোগিতাগুলোতেও একই ধরনের যৌথ পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাবে। চলতি বছরের বয়স্বিত্তিক টুর্নামেন্ট এবং ২০২৭ সালের নারী বিশ্বকাপেও ম্যাচ কারসাজি ঠেকাতে এই ধরনের ব্যবস্থা বজায় রাখা হবে।