বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলায় সরকারি দরেই ধান বিক্রি করতে না পারায় কৃষকদের কান্না থামছে না। উপজেলা খাদ্য গুদাম কর্মচারীসহ একদল দালালের দুর্ব্যবহার ও হয়রানির অভিযোগ এনে হতদরিদ্র কৃষকেরা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। অনেকেই এখন বাজারে কিংবা দরজায়-দরজায় ঘুরছেন—হাজার কষ্টে উৎপাদিত ধান বিক্রি না হওয়ায় পরিবার চালানোর চিন্তায় তারা দিশেহারা।
সরকারি লক্ষ্য অনুযায়ী চিতলমারী উপজেলায় ১ হাজার ৩৬৩ মেট্রিক টন ধান এবং ২ হাজার ১৭৯ মেট্রিক টন চাল ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সরকার ধানের মূল্য নির্ধারণ করেছেন কেজিতে ৩৬ টাকা ও চালের মূল্য কেজিতে ৫০ টাকা। মাইকিং করে সংগ্রহ শুরু করার কথা থাকলেও কৃষকদের অভিযোগ, যখন তারা ধান নিয়ে খাদ্য গোডাউনে যান, তখন ভারপ্রাপ্ত খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা মুহাইমিনুল তাদের কাছ থেকে কৃষক কার্ড জমা নেন, তবু তাঁদের থেকে ধান কিনে নেওয়া হয়নি। তারা বলছেন, কর্মকর্তা সুবিধাবঞ্চিত প্রকৃত কৃষকদের উপেক্ষা করে প্রভাবশালীদের কাছ থেকে ধান ক্রয় করে গোডাউন ভর্তি করে রেখেছেন এবং কৃষকদের নানা ভাবে হয়রানি করছেন।
কৃষকরা অভিযোগ করেন, গোডাউনের আশেপাশে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠে যা সাধারণ কৃষকদের ধান বিক্রিতে বাধা দিচ্ছে। কেউ গেলে গোডাউন ঘিরে রেখে বাইরের প্রভাবশালীদের ধানই নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, মোটা অঙ্কের আর্থিক বা প্রাকৃতিক কেজি-অনুপাতে অনিয়ম ও উৎকোচের কথাও উঠেছে—সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বস্তা সহ ৪১ কেজি ২০০ গ্রাম ধান নেওয়ার কথা থাকলেও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৪২ কেজি ২০০ গ্রাম নেওয়ার অভিযোগ আছে। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, প্রতি ৫০ মণ ধানে ৩ মণ করে বা কিছু ক্ষেত্রে ২ মণ করে অতিরিক্ত ধান দাবি করা হয় এবং সংগ্রহের সময় কোন ভাউচার বা রশিদ দেওয়া হয় না, ফলে সরকারের রাজস্বও কাটা হচ্ছে।
শিবপুর কাটাখালীর কৃষক ঠান্ডা ফকির বলেন, ‘আমি যখন ধান নিয়ে গেলাম, গোডাউনের কর্মকর্তা মুহাইমিনুল প্রতি ৫০ মণ ধানে অতিরিক্ত ২ মণ করে ধান উৎকোচ দাবি করলেন। আমি ঘুষ দিতে অস্বীকার করলে তিনি আমাকে গালিগালাজ করে অফিস থেকে বের করে দেন। তিনি অত্যন্ত দুর্নীতিবাজ, গুদামকে কেন্দ্র করে সিন্ডিকেট গড়ে অবৈধ সম্পদ সঞ্চয় করেছেন—এই কারণেই আমরা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছি।’
খড়মখালী গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান জানান, তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে বোর ধান উৎপাদন করেছেন এবং একজন মসজিদের মোয়াজ্জিন। ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁর ধান ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি বিষয়টি ইউএনওর কাছে জানান, তখন ইউএনও গোডাউন কর্মকর্তাকে মোস্তাফিজুরের ধান গ্রহণের নির্দেশ দেন। তবুও ওই কর্মকর্তা তাঁকে খারাপ ভাষায় গালমন্দ করেন এবং এখন মোস্তাফিজুর ধান নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
হিজলা গ্রামের কৃষক মোঃ ইসহাক কেঁদে বলেন, ‘কর্মকর্তার অসভ্য আচরণ ও হয়রানিতে আমি এখন দিশেহারা। সরকারি দামে ধান বিক্রি না করতে পারলে আমাদের চরম ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।’ আড়–য়াবর্নি গ্রামের কৃষক মোঃ শরিফুল হক দাবি করেন, ‘গোডাউনটি এখন একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের হাতে। এদের বাইরে কোনো কৃষকের ধান এখানে গ্রহণ করা হয় না; তারা ঘুষ ও কোটাভিত্তিক ব্যবসাও পরিচালনা করেন।’
অভিযোগ অস্বীকার করে চিতলমারীর ভারপ্রাপ্ত খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা মুহাইমিনুল বলেন, ‘কারো অভিযোগ করার অধিকার আছে। ধানে যদি মানগত সমস্যা থাকে, তার ক্ষতি আমি কী করে বহন করব? এসব অভিযোগে কেন কান দিচ্ছেন?’—এ ধরনের প্রতিক্রিয়া দেন তিনি।
চিতলমারী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোঃ কাওছার আহমেদ জানান, ‘ইউএনও স্যারের কাছ থেকে আমাকে ফোন এসেছে, আমি আজ অফিসে নেই। আগামীকাল অফিসে এসে কথা বলবো।’ চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা আক্তার বলেন, ‘এ ধরনের কোনো লিখিত অভিযোগ আমার কাছে আসেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
কৃষকরা ঘটনার স্বচ্ছচ পরীক্ষা, দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং সরকারি ক্রয়ের কাজে প্রকৃত কৃষকদের অন্তর্ভুক্তি দাবি করছেন। এলাকাবাসী ও অধিকারকর্মীরা বলছেন, দ্রুত তদন্ত ও যথাযথ তদবির না করলে ক্ষতিগ্রস্ত হাজারো কৃষকের ভোগান্তি বাড়বে।