সুন্দরবনের কুখ্যাত বনদস্যু ছোট সুমন ও তার সহযোগী হিসেবে পরিচিত সাতজন আজ (২১ মে, বৃহস্পতিবার) দুপুরে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছেন। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দলের পাশাপাশি খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার জেলা প্রশাসকদের প্রতিনিধি, র্যাব, পুলিশ ও বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এবং আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।
পটভূমিতে জানা যায়, ছোট সুমন ২০১৮ সালে তখনকার সরকারের উদ্যোগে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তখনই আত্মসমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের আইনশৃঙ্খলার সাময়িক শিথিলতা কাজে লাগিয়ে তিনি আবার সুন্দরবনের গভীরে ফিরে গিয়ে দস্যুবৃত্তি শুরু করেন। বর্তমানে সুন্দরবনে আনুমানিক ৮–৯টি সক্রিয় বনদস্যু বাহিনী সাধারণ জেলে, বাওয়ালী ও মৌয়ারদের বিরুদ্ধে ত্রাস সৃষ্টি করে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় করছে।
সূত্র বলছে, এসব বাহিনীর প্রত্যেকের কাছে রয়েছে দেশি ও বিদেশি নানা ধরনের আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ। বৃহৎ সদস্যবাহিনীর এই দলগুলো নিয়মিত টাকার জন্য অসহায় জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করত। চলতি সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর চক্রবর্ধমান অভিযানের ফলে ছোট সুমনের বাহিনী চাপে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করা ছাড়া উপায় না দেখে এমন সিদ্ধান্ত নেয়।
বৃহস্পতিবার কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণকারী সাতজনের মধ্যে ছিলেন দলনেতা সুমন হাওলাদার (৩২), রবিউল মল্লিক (২৫), রফিক শেখ (২৯), সিদ্দিক হাওলাদার (৪০), গোলাম মল্লিক (৩৮), ইসমাইল খান (৩১) ও মাহফুজ মল্লিক (৩৪)। তাদের কাছ থেকে কোস্ট গার্ডকে হস্তান্তর করা হয়েছে ৩টি দেশীয় একনলা বন্দুক, ২টি দেশীয় পাইপগান, ২৫ রাউন্ড তাজা কার্তুজ ও ৩ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ। আটককৃতদের বাড়ি বাগেরহাট জেলার মোংলা ও রামপাল উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, দীর্ঘদিন তারা সুন্দরবনে ডাকাতি ও জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ে জড়িত ছিল।
ছোট সুমন নিজে অপরাধের পথ ছেড়ে সুস্থ জীবনে ফিরলেও, বন ও বাইরে যারা তাঁকে অর্থ, রসদ ও অস্ত্র সরবরাহ করত তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তল্লাশি অব্যাহত রেখেছে। কর্তৃপক্ষ এসব গডফাদার ও সহযোগীদের শনাক্ত করে চিরুনি অভিযান চালাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। স্থানীয় পরিবেশে আত্মসমর্পণের খবরে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও জনগণ আশা করে অবশিষ্ট দস্যু বাহিনীগুলোও দ্রুত নিপ্তন করা হবে।
কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম জানান, সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করার জন্য কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে “অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন” এবং “অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড” নামে দুটি বিশেষ অভিযান চলছে। ওই অভিযানের শুরু থেকেই—১২ ফেব্রুয়ারি থেকে এখনও পর্যন্ত—বিভিন্ন কার্যক্রমে ২৬টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৭৮ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ২৫ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ১৮৭ রাউন্ড এয়ারগান গোলা, ২টি ওয়াকিটকিসহ বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার এবং ২১ জন বনদস্যুকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া দস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা মোট ২০ জনকে জীবিত উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ক্যাপ্টেন মেসবাউল বলেন, সুন্দরবনের সক্রিয় দস্যুদের সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে অপরাধ ত্যাগ করে কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুন; আত্মসমর্পণ করলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া হবে। যারা আত্মসমর্পণ না করে অপরাধ চালিয়ে যাবে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার ঘোষিত “জিরো টলারেন্স” নীতির আলোকে আরও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবনের ৩২টি বাহিনীর ৩২৮ জন জলদস্যু বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করায় তখন সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক ঘটনায় দেখা যাচ্ছে পূর্ণ দস্যুমুক্তি নিশ্চিত করতে এখনও দফায় দফায় অভিযান চলতেই হবে—এটাই স্থানীয়দের প্রত্যাশা।