যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘর্ষে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে যুদ্ধবিরতিকে প্রশংসা করা হয়েছে এবং এটাকে পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি আনার সম্ভাবনার কড়া হিসেবে দেখা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংঘাতের ধ্বংসাত্মক প্রভাব স্পষ্ট এবং এটি বিশ্বব্যাপী তেল, জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যকে ব্যাহত করেছে; বাণিজ্যিক ও তেলবাহী জাহাজগুলো যাতে নিরাপদে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে পারে সে আশাও ব্যক্ত করা হয়েছে।
তবে একটাই জিনিস—পাকিস্তানের ভূমিকা—এই সরকারি বিবৃতিতে পুরোপুরি উপেক্ষিত ছিল। বিশ্ব নেতারা যখন পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রশংসা করছিলেন, তখন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাকিস্তানের নামই উল্লেখ করেনি এবং ইসলামাবাদে সম্ভাব্য আলোচনাক্রম সম্পর্কেও কিছু বলেনি।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকে অনেকে বিশ্বমঞ্চে সফল বলে অভিহিত করেছেন। কংগ্রেস নেতা রশিদ আলভি বলেছেন, এমন ভূমিকা ভারতের করা উচিত ছিল। তাঁর প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েলকে বিশেষ মর্যাদা দিলে তিনি কীভাবে যুদ্ধবিরতির কথা বলতে পারবেন? অন্যপক্ষে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেছেন, ভারত ‘ব্রোকার নেশন’ বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চায় না।
দীর্ঘ অভিজ্ঞ কূটনীতিক ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা মেনন রাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, পাকিস্তানের ভূমিকা সরল অর্থে মধ্যস্থতা বললে ভুল হবে—বরং তারা মেসেজ আদান-প্রদান, সময়সীমা শিথিল এবং সংকীর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করে দিয়ে পরিস্থিতি մեղন করেছে। তিনি বলেন, এটা সংঘাতের স্থায়ী সমাধান নয়; বরং অবস্থানগুলোর পুনর্বিন্যাস, যেখানে বলপ্রয়োগ ও আলোচনা একসঙ্গে চলছে। তাই ভারতের উচিত স্পষ্টভাবে নিজের অবস্থান জানানো—উত্তেজনা প্রশমনকে সমর্থন করা, সমুদ্রপথে নেভিগেশন রক্ষা করা এবং সংঘাতকারীদের বিবৃতির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করার থেকে বিরত থাকা। তিনি উল্লেখ করেন, নীরব থাকা ঠিক নেই; বদলে পরিমিত কণ্ঠে বক্তব্য রাখা জরুরি।
বিশ্লেষক অশোক সোয়াইন এই যুদ্ধবিরতিকে ইরানের জয় ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, বিশ্বমঞ্চে মোদি যখন পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছিলেন, তখন উলটে ভারতই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, অতীতেও পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতা করে এসেছে—এবং এখনও তারা যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইরানের মধ্যকার আস্থা অর্জন করতে পেরেছে।
অপর বিশ্লেষক অভিনব সিং সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানই একমাত্র দেশ যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, উপসাগরীয় দেশসমূহ ও ইরানেরও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে ভারতের কূটনীতি ও নেতৃত্বের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ কিছু টুইট ও মন্তব্য তােমনি গুরুত্ব পেয়েছে—কেউ কেউ পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকে ‘বড় কূটনৈতিক সাফল্য’ বলছেন, আবার অনেকে বলছেন ভারতের কূটনীতি ও সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আত্মসমীক্ষার প্রয়োজন। সাংবাদিক অঞ্জনা শঙ্কর ও কয়েকজন লেখকও প্রকাশ্যভাবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার তাৎপর্য স্বীকার করেছেন।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের তেল ও পরিশোধিত পণ্যের ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, তবে সাত বছরের মধ্যে প্রথমবার ইরান থেকে তেল ভারত পৌঁছাতে পারে—এই সপ্তাহেই একটি তেল ট্যাংকো এসে পৌঁছাবে।
নাগরিক-শ্রেণি ও মন্তব্যকারীরা এখন ভারতের কূটনীতি, মতামত প্রকাশের সময় এবং ভুবনীয় সম্পর্ক নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছেন। অনেকেই মনে করছেন, পাকিস্তানের যেসব কূটনৈতিক উদ্যোগ এবার কার্যকর হয়েছে, সেগুলো নিয়ে ভারতকে আত্মসমীক্ষা করতে হবে—কী কারণে আমরা সে জায়গায় ছিলাম না, আর ভবিষ্যতে কিভাবে আমাদের অবস্থান সুসংহত করা যাবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা