1. [email protected] : Staff Reporter : Staff Reporter
মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ১০:২০ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ খবরঃ
কাফরুলে চলন্ত মোটরসাইকেলে ইটপ্রহারে আহত রাফি মারা গেলেন মালয়েশিয়া সফর শেষ করে চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুজব ঠেকাতে পিআইডির ফ্যাক্ট-চেকিং কার্যক্রম অব্যাহত: তথ্যমন্ত্রী কাফরুলে চলন্ত মোটরসাইকেলে ইটপ্রহর; সাজিদ চৌধুরী রাফি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ দুদক কমিশনার নিয়োগের জন্য পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন কাফরুলে চলন্ত মোটরসাইকেলে ইটের আঘাতে রাফির মৃত্যু গেজেটে ঘোষণা: এক বছরব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ’ (২৫ মে–২৫ মে) জিয়াউল আহসানের দেহরক্ষী ইমরুল কায়েসের দাবি: ১৫০–২০০ জনকে হত্যা করতে দেখা ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্টের অভিযোগ: বহিষ্কৃত শিবির নেতা জিসান ২ দিনের রিমান্ডে বগুড়ায় শিশু রিফাত হত্যা: পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড

চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত: বিপদ না কি সুযোগ?

  • আপডেটের সময় : শনিবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০২৬

এখনো ২০২৬ সালের শুরুতেই, চীনের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান বিশ্বকে বিস্মিত করেছে। মাত্র দুই সপ্তাহে, বিশ্ব দেখছে যে, ২০২৫ সালে দীর্ঘ সময়ের শুল্ক যুদ্ধের প্রভাব সত্ত্বেও, চীনের রপ্তানি বেড়েই চলেছে, আর বাণিজ্য উদ্বৃত্তের পরিমাণ রেকর্ড ১.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে—যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ স্থান অর্জন করেছে।

এই তথ্য হঠাৎ করে প্রকাশিত হওয়ার পরপরই নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক নিবন্ধে সতর্কবার্তা দিয়েছেন কর্নেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো ঈশ্বর প্রসাদ। তিনি উল্লেখ করেছেন, চীনের এই বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অনেকটাই মার্কিন ট্রাম্পের শুল্কের চেয়েও বড় এক বিপদ।

প্রফেসর প্রসাদ যুক্তি দিয়েছেন যে, চীনের সস্তা পণ্য বিশ্বজুড়ে উন্নত দেশগুলোর উৎপাদন খাতের ক্ষতি করছে, পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের জন্যও টিকে থাকাটা কঠিন করে তুলছে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘‘বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে নিজের প্রবৃদ্ধির জন্য নিজের ওপর আস্থা না রেখে অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়া বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য সুড়ঙ্গের মতো ঝুঁকির সৃষ্টি করছে।’’

অন্যদিকে, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের সাবেক সম্পাদক হু সিজিন ১৬ জানুয়ারি সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্টে ভিন্ন সুর শোনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, চীনের এই বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ওয়াশিংটনের অভিজাত শ্রেণির জন্য চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। তারা বুঝতে পেরেছেন, দেশের অর্থনীতি খুবই স্থির, আর তাতে কোনো বাণিজ্য যুদ্ধের মাধ্যমে দমন করা সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেছেন, চীন শুধু সততা ও পরিশ্রমের ভিত্তিতে বিশ্ববাজারে তার পণ্য সরবরাহ করছে। নেপথ্য কারণ হলো, চীনের রেকর্ড রপ্তানি ও কম আমদানির মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া এই ভারসাম্যহীনতা। এর মূল কারণ হলো, শক্তিশালী রপ্তানি প্রবাহ এবং দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা।

গত বছর, মার্কিন-চীন শুল্কযুদ্ধের ফলে, চীনের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ২০ শতাংশ কমলেও, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, আসিয়ান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আফ্রিকায় রপ্তানি রেকর্ড ২৫.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, চীনের মুদ্রার মান কমে যাওয়া এবং চীনা পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে।

চীনের আমদানির অবস্থা তুলনামূলকভাবে আরও দুর্বল। হয়তো ২০২৫ সালে তার মোট আমদানির পরিমাণ বছরে মাত্র ০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা রপ্তানির ৬.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় খুবই কম। এই পরিস্থিতির জন্য মূলতঃ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদার অভাবকে দায়ী করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনে ভোক্তা পণ্যের খুচরা বিক্রির হার ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে ক্রমশ হ্রাস পেয়েছে, বিশেষ করে নভেম্বরে এটি সর্বনিম্ন ১.৩ শতাংশে নেমে গেছে। এছাড়া, রিয়েল এসেট বা স্থাবর সম্পদে বিনিয়োগে সংকোচন দেখা দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে, ১৯৯৮ সাল থেকে উপলব্ধ তথ্য সংরক্ষণের পর এই প্রথমবারের মতো বার্ষিক বিনিয়োগ পতনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সবমিলিয়ে, অভ্যন্তরীণ ভোক্তা ও বিনিয়োগের এই স্থবিরতা অমীমাংসিত রেখেছে আমদানির লক্ষ্যও।

মাসিক ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অনেক মাসে ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যেখানে ২০২৪ সালে একবার এ ঘটনা ঘটেছিল। এই তথ্য প্রমাণ করে, চীনের শক্তিশালী রপ্তানি এবং কম আমদানির এই অসামঞ্জস্য সাধারণ নয়, বরং এক ধরনের স্থায়ী ধারা।

অর্থনীতিবিদের ধারণা, এই বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্তের পেছনে চীনের উৎপাদন খাতের শক্তিশালী অবস্থান কাজ করছে, যা দেশের অর্থনীতিকে টেকসই রাখতে এবং বিশ্ব অর্থনীতির ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করছে। একইসঙ্গে, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট ও সরবরাহ শৃঙ্খলের চেহারার পরিবর্তনের সময়ে, চীন সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চমানের পণ্য সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। এর ফলে, বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং দেশের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে চীন।

তবে, এর অন্য একটি দিকও রয়েছে। এই উচ্চ বাণিজ্য উদ্বৃত্তের মূল কারণ হলো, চীনের অতি-নির্ভরশীলতা রপ্তানির ওপর। যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির কাঠামো আরও ভারসাম্যহীন হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে, বিশ্ব বাজারে চাহিদা শক্তিশালী থাকলেও, অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল থাকতে পারে, যা স্বয়ং চীনের জন্য ঝুঁকির কারণ। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর ফলে বাণিজ্য অংশীদাররা ক্ষুব্ধ হতে পারে এবং চীনা পণ্য পুনরায় বাধার মুখে পড়তে পারে।

বর্তমানে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুল্ক বিরতিতে থাকলেও, এই বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অনেক সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়। একইভাবে, অন্যান্য দেশের মধ্যেও সতর্কতা বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরের প্রথম ১১ মাসে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত এক ট্রিলিয়নের বেশি থাকায় আইএমএফের প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সতর্ক করে বলেছেন, ‘‘যদি চীন রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধির ওপরই অটল থাকে, তবে তা বিশ্ব বাণিজ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেবে।’’’ এ প্রসঙ্গে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেন, ‘‘বেইজিং যদি ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে ইউরোপ তার ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের পথ খুঁজে নেবে।’’

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং সম্প্রতি গুয়াংডং প্রদেশে বলেছেন, দেশের উচিত সক্রিয়ভাবে আমদানির পরিধি বাড়ানো এবং রপ্তানি-আমদানির মধ্যে আরো সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা। পাশাপাশি, বাণিজ্য মন্ত্রী ওয়াং ওয়েনতাও-ও ঘোষণা করেছেন, চলতি বছরে বিভিন্ন পর্যায়ে বাণিজ্য সমন্বিত এবং লক্ষ্যভিত্তিক ক্রয় কার্যক্রমের মাধ্যমে, আমদানি বাড়ানোর জন্য কাজ করবেন।

এই সমস্ত প্রতিশ্রুতি ও পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে গেছে, বেলাগামী বাণিজ্য উদ্বৃত্তের বিশাল পরিমাণ এখন আর অপব্যবহার বা অনিয়ন্ত্রিত বাড়তির পথে থাকবে না। ২০২৬ সালে এই ইঙ্গিত আরও জোরদার হয়েছে, যেখানে নতুন প্রযুক্তি যেমন বৈদ্যুতিক গাড়ি, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি, এবং সোলার সেল নিয়ে দেশের বিরোধিতা ও দৃষ্টি রয়েছে। এমনকি, চীন জানিয়েছে, আগামী এপ্রিল থেকে তারা ফটোভোলটাইক পণ্যের রপ্তানি ভ্যাট রিবেট বাতিল করবে, ব্যাটারি পণ্যেও এর হারে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর পাশাপাশি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বৈদ্যুতিক গাড়ি শুল্ক সমঝোতাও হয়েছে, যা চীনা গাড়ি নির্মাতাদের ব্যবসার নতুন দিক দেখাচ্ছে।

সবশেষে, এই বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্তটি যেন স্বয়ং এক আশীর্বাদ বা অভিশাপ—তার নির্ভর করছে মূলতঃ এর ব্যবহার, দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে তার অর্থপ্রবাহ, এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রভাবের উপর। সুতরাং, কেবলমাত্র পরিসংখ্যান নয়, এই উদ্বৃত্তের সঠিক পরিচালনা ও ব্যালান্সই ভবিষ্যতের চীনের ও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সফলতা বা বিপদ নির্ধারণ করবে।

এই পোস্টটি আপনার সামাজিক মিডিয়াতে শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও খবর
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | সকালেরফেনি.কম
Design & Developed BY HostingNibo