বাগেরহাটের চিতলমারী থানা এলাকার চিংগড়ী গ্রামে জমি-আধিপত্য বিরোধকে ঘিরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে রাতে স্বল্প তরঙ্গের সংঘর্ষে পরিণত হয়ে ব্যাপক হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত এক যুবক নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন; স্থানীয়রা জানাচ্ছেন প্রায় ৪০টি বাড়িঘর ও দোকান ভাঙচুর-লুটপাট ও অগ্নিদগ্ধ হয়ে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় তথ্যের বরাতে জানা যায়, সংঘর্ষের মূল সূত্রপাত ছিল মধুমতি নদীর চর জমি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিশ্বাস গ্রুপ ও শেখ গ্রুপের পুরোনো বিদ্বেষ থেকে। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চিংগড়ী গ্রামে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে। সংঘর্ষের পর এক দফায় সশস্ত্র ও সংগঠিত হামলায় অনেক বাড়িতে petrol ও পিচ ঢেলে আগুন দেওয়ার, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
এই সহিংসতায় নিহত হয়েছেন রাজিব শেখ (২৫)। আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন বলে সূত্রে জানা গেছে। শনিবার সকাল পর্যন্ত এলাকায় থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে; স্থানীয়রা বলছেন যেকোনো সময় উত্তেজনা আবার ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভেতরের দিকে গিয়ে দেখা গেছে, চিতলমারী-পাটগাতি সড়কের চিংগড়ী ও মচন্দপুর গ্রামের মাঝামাঝি এলাকায় সড়কজুড়ে ইটখোড়া ছড়িয়ে আছে। শেখ বাড়ির দিকে গেলে পোড়ার গন্ধ ছড়িয়ে, ধ্বংসস্তূপ আর অর্ধদগ্ধ বসতবাড়ি চোখে পড়ে। অনেক পরিবারের শেষ সম্বলকেও পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে; অনেকের একবেলা খাবারের জোগাড় নেই। নিহত রাজিবের বাড়ির পেছনে দুই ডেক্সিতে একসঙ্গে সবাই মিলে খাবার রান্না করা হচ্ছিল।
ক্ষতিগ্রস্তরা অভিযোগ করেছেন, ঘটনার দিন বিকেলে আরিফ শেঠ নামে এক যুবক মোটরসাইকেলে গেলে বিশ্বাস পরিবারের কিছু লোক দায়ের করে তাকে ফুলকুচি দিয়ে আঘাত করে। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে শেখ ও বিশ্বাস পরিবারের লোকজনের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়ে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। স্থানীয়দের দাবি অনুসারে সাইদ বিশ্বাস ও সোহাগের নেতৃত্বে একদল লোক শেখ বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালায়।
ক্ষতিগ্রস্ত লিয়াকত শেখ বলেন, “আগুন দিয়ে আমার সব শেষ করে দিয়েছে, কি খাবো জানি না। আমরা তো কারও সঙ্গে মারামারি করিনি।” মনোয়ারা বেগম জানিয়েছেন, স্ত্রী-স্বামীর অসুস্থতার মধ্যেও তাদের ধান ও অন্যান্য জিনিসপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। জয়নব বেগম বলেন, বাড়ি মেরামত করতে নেওয়া ৫০ হাজার টাকার ঋণ আর কিছু পশু ছিল, তা পুড়ে গেছে; প্রাণভয়ে আইনের আশায় আছেন।
আবার কিছু স্থানীয়রা পুলিশ কর্তাদের আচরণকে নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। মোবাইল ফোনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলার সময় পুলিশ ও কিছু দুর্বৃত্তের সঙ্গে সংঘর্ষে তাদের ওপরও নির্যাতন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে; তারা পুলিশের বিরুদ্ধে নুরে আলম দারগা (এসআই) নামের এক কর্মকর্তার নেতৃত্বে তাঁরা সহায়ক ভূমিকা নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। এসব অভিযোগ পুলিশ অস্বীকার করেছে না-এমনভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
পুলিশ জানায়, সংঘর্ষের ঘটনাস্থলে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস দ্রুত পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। অভিযোগের কারণে সৌরভ বিশ্বাস (১৯) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিহত রাজিবের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বাগেরহাট অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ শামীম হোসেন বলেছেন, কয়েকটি বসতবাড়ি ও দোকানে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হয়েছে; অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চলছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।
চিতলমারী ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার আব্দুল ওয়াদুদ জানান, খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌছানোর চেষ্টা করা হলেও আগুন নেভাতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে; তাদের হিসাব অনুসারে আনুমানিক ২০-২৫টি বসতঘর পুড়েছে। একযোগে চারটি ইউনিট কাজ করে প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
স্থানীয়দের অনেকে তাদের মূল্যবান জিনিসপত্র নিকটাত্মীয়দের বাড়িতে পাঠাচ্ছেন; তাতে করে অস্থায়ীভাবে অনেকেই নিরাপত্তা সংকটে পড়েছেন। পুরোনো জমি-সংক্রান্ত বিরোধ ও হত্যা-ঘটনার কারণে দুই পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা ছিল বলে স্থানীয়রা জানান। বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জনজীবন অস্বস্তিতে আছে এবং দ্রুত আইনি তদন্ত ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানাচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।